রক্তাক্ত নিথর দেহটা থানা চত্বরে অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে সাদা কাপড়ে ঢাকা! চারপাশে মানুষের ভিড়, ফিসফাস আর নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে বুকফাটা আর্তনাদ, ‘ওগো তুমি আমাকে এভাবে ফেলে গেলে কেন? এখন আমি মেয়েকে নিয়ে কিভাবে বাঁচবো?’
স্বামীর লাশের পাশে এভাবেই আহাজারি করছিলেন নিহত হুমায়ন কবীর (৫৭) ওরফে মিন্টু মোল্লার স্ত্রী ফরিদা বেগম। ফরিদপুরের বোয়ালমারীর চতুল গ্রামের নিহতের বাড়িটি ও থানা চত্বর পরিণত হয়েছে শোকের মাতমে।
বুধবার (২৫ মার্চ) সকালে পৈতৃক জমির গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে বড় ভাইয়ের সটগানের গুলিতে নিহত হন মিন্টু মোল্লা। এ ঘটনার কয়েক ঘন্টা পরে স্থানীয় থানায় আনা হয় তার মরদেহ। আর সেই মরদেহ ঘিরেই শুরু হয় স্ত্রী ও সন্তানের হৃদয়বিদারক কান্না।
স্ত্রী ফরিদা বেগম বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরতেই আবার ছুটে গিয়ে স্বামীর নিথর দেহ আঁকড়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। এই মানুষটাই ছিল আমার সহায় সম্বল’।
আরেক পাশের দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির কোলে কাঁদছিল তাদের একমাত্র মেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী ফাবিহা কবীর। ‘বাবার নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে তার ছোট্ট মুখে “বাবা, তুমি উঠো …. তুমি কেন কথা বলছো না?’
কিছুক্ষণ পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, “আমার বাবাকে কেড়ে নিলো। আমি এখন এতিম হয়ে গেলাম। আমার পড়াশোনা কীভাবে চলবে? আমি বাবার খুনির বিচার চাই।”
পরিবারের আত্মীয় স্বজনরা জানান, মিন্টুই ছিলেন এই ছোট্ট পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তার রোজগারেই চলতো সংসার, মেয়ের পড়াশোনা সবকিছু। এক মুহূর্তে সেই ভরসার জায়গাটাই ভেঙে পড়েছে। খুনির মামলার যন্ত্রণায় মিন্টুর কিছুই সহায় স্বম্বল নাই।
গ্রামের প্রতিবেশীরা বলেন, সামান্য গাছ নিয়ে এমন ভয়ংকর ঘটনা ঘটবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। এখন এই পরিবারটার দিকে তাকালে চোখে পানি চলে আসে রীতিমত।
লাশের অ্যাম্বুলেন্সের পাশে পড়ে আছে মেয়ের স্কুলব্যাগ, খাতাপত্র-যেখানে হয়তো লেখা ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে গেল।
এ ঘটনার পর বিকেলে নিহতের স্ত্রী ফরিদা বেগম বাদী হয়ে গোলাম কবির, তার দ্বিতীয় স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগমসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে বোয়ালমারী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আসামি স্বামী-স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেইন বলেন, আটকৃত স্বামী-স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে আদালতে পাঠানো হবে।

মো. নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬ । ৭:৫০ পিএম