তিন বছরেও শেষ হয়নি নগরকান্দা হাসপাতাল ভবন, বারান্দায় চলছে চিকিৎসা

এহসানুল হক, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬ । ১২:৩৪ অপরাহ্ণ

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় তিন বছরেও শেষ না হওয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যসেবা সংকট তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য পুরাতন মূল ভবন ভেঙে ফেলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি জরাজীর্ণ পুরাতন ভবনের কয়েকটি কক্ষ ও বারান্দায়। এতে করে চিকিৎসা ব্যবস্থায় নেমে এসেছে অচলাবস্থা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অনেকেই বারান্দা ও মেঝেতে অবস্থান করছেন। নারী ও পুরুষ রোগীদের একসাথে একই স্থানে থাকতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার ন্যূনতম মানদণ্ডের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এতে রোগীদের মধ্যে বাড়ছে অস্বস্তি, নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অস্থায়ী ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত টয়লেট ও ওয়াশরুম সুবিধা নেই। ফলে রোগী ও তাদের স্বজনদের জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটা কোনো হাসপাতালের পরিবেশ হতে পারে না। রোগী নিয়ে এসে এখানে যেন আরও বিপদে পড়তে হচ্ছে। চিকিৎসার পাশাপাশি ন্যূনতম মানবিক পরিবেশটুকুও পাচ্ছি না।”

এদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা ও শিশু রোগীসহ বিভিন্ন মুমূর্ষু রোগীরা জরুরি চিকিৎসার জন্য এখানে এলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও জনবল সংকটও রয়েছে। প্যাথলজি বিভাগ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে, ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেও রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কাজ সম্পন্ন হয়নি।

ঠিকাদার মো. শরাফত মিয়া জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি পুনরায় টেন্ডার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, “সারা দেশে একই ধরনের প্রায় ১৪০টি প্রকল্প বন্ধ রয়েছে। নতুন করে সবগুলো একসাথে চালু হবে। এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের কিছু করার সুযোগ নেই।”

নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এইচ এম নূরুল ইসলাম খান বলেন, “ভবন সংকটের কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকদের বারান্দায় বসে রোগী দেখতে হচ্ছে। ভর্তি রোগীদেরও বারান্দা ও মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। সামনে বর্ষা মৌসুম এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ না হলে স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, নির্মাণাধীন ভবনের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও বর্তমানে নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “খুব শিগগিরই কাজ পুনরায় শুরু হবে এবং দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে।”

এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দা, রোগী ও তাদের স্বজনরা দ্রুত হাসপাতালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন