দার্শনিক হবসের ‘লেভিয়াথান’ নামক একটি গ্রন্থ আছে। রাষ্ট্রবিষয়ক নানাবিধ আলোচনার মধ্যে রাষ্ট্র নির্মাণের পেছনের পরিস্থিতির কিছু কাল্পনিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন তিনি এই বিখ্যাত গ্রন্থে। তার মতে, রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পূর্বে প্রকৃতির রাজ্য বিরাজিত ছিল। এই প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, এখানে মানুষ ছিল অবাধভাবে স্বাধীন। সবাই যথেচ্ছা সুযোগের সন্ধানে লিপ্ত ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সুগঠিত কর্তৃপক্ষ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করত না; যে যার মত সুযোগ নেওয়ার উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল সেই প্রকৃতির রাজ্যে।
তথাপিও যেমন খুশি তেমন ইচ্ছা অবাধ স্বাধীনতার এই জামানা মানুষের জন্য শান্তিময় ছিল না, বরং তা ছিল সংঘাতময়। এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে : মানুষের চাহিদা অপরিসীম, মানুষ অল্পে তৃপ্ত হয় না। সুযোগ অবারিত থাকলে যে যার মতো করে সর্বোচ্চ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আর এই অবস্থা কারো জন্য সুখকর হয় না, এই কারণে যে, কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। তাই তথাকথিত নিকটজন বলতে কেউ থাকেনা। সবাই সবার সাথে প্রতিযোগিতা করে; আর এই প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রকৃতির রাজ্যের অবস্থা ব্যাখ্যায় এক কথায় এই বাস্তবতাকে হবস চিহ্নিত করেছেন প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের যুদ্ধ হিসেবে। আসলে অবাধ সুযোগ সংঘাতকেই যেন স্বাগত জানায়।
রাষ্ট্র উৎপত্তির পেছনের ইতিহাস যাই হোক না কেন, আর সেক্ষেত্রে হবসের প্রকল্প সত্য হোক বা মিথ্যা হোক- সে আলোচনা এখন আর খুব দরকারি না। কেননা বাস্তবতা হলো এখন রাষ্ট্র আছে। পৃথিবীময় মানুষ এখন এক একটি রাজনৈতিক সমাজে বসবাস করছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে মানুষের সমাজজীবন পরিচালিত হচ্ছে। তবে সব রাষ্ট্রের বাস্তবতা এক রকম নয়। সরকার ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী অনেকাংশে রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ভর করে। আর শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের গতি-প্রকৃতি ও জনগণের সুবিধা-অসুবিধা।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সাংবিধানিকভাবে এই রাষ্ট্রে জনগণকেই বলা হয় সকল ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। যদিও সেই সরকারে জনগণের কর্তৃত্ব বা অধিকার কতটা সুরক্ষা পায় তাও নির্ভর করে শাসক শ্রেণির মানসিকতা, দক্ষতা ও রাজনৈতিক দর্শনের উপর। সংসদীয় গণতন্ত্রে আসন ভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার তারতম অনুযায়ী সরকারের ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। ২০২৬- এর নির্বাচনের পরে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। এমনকি সংসদে দুই তৃতীয় অংশের বেশি আসন নিয়ে এক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে দলটি। এই বাস্তবতায় সরকারের ক্ষমতা এখন একচ্ছত্র। আর যেহেতু এটি একটি দলীয় সরকার, তাই সরকারি দলের নেতা কর্মী সমর্থক ও সুনজরপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের সামনে এখন সৃষ্টি হয়েছে অবারিত সুযোগ, অপার সম্ভাবনা। সংগত কারণেই এই বাস্তবতায় এইসব সুযোগধারী বা সম্ভাবনাময়ী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের নিরলস প্রতিযোগিতা। অনেকেই বিরতিহীনভাবে দৌড়াচ্ছেন। কোনটা রেখে কোনটা নেবেন, কোথায় গিয়ে থামবেন-তা কেউ কেউ বুঝে উঠতে পারছেন না।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘হেথা নয়- অন্য কোথা, অন্য কোথা— অন্য কোনখানে?’ কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না, কেউ কম পাচ্ছেন, আবার কেউ যা পাওয়ার কথা তার চেয়েও বেশি পাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন যে, পেয়ে খুশি হওয়া মানুষের চেয়ে না পেয়ে বা অল্প পেয়ে অখুশি মানুষের সংখ্যাই বেশি। আরো ছোট করে বললে সরকার দলের অসংখ্য চাহিদাওয়ালা মানুষই থেকে যাচ্ছে নাখোশ, এমনকি ক্ষুব্ধ। দলের উপর, দলের কোনো কোনো নেতার উপর, সরকারের উপর, এমনকি সহযোদ্ধা প্রিয়জনদের উপরও অনেকেই হয়ে উঠছেন ক্রমশ আস্থাহীন।
এই বাস্তবতা দার্শনিক হবসের প্রকৃতির রাজ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং সুবিধার সন্ধানে প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষের মধ্যে সম্পর্কের বাঁধন বিনষ্ট হয়ে সংঘাত যদি ব্যাপকতার হয়ে ওঠে, তবে তা নিতান্তই অশনি সংকেত। সরকারের বড় পদে গেলে বা সরকার পরিচালনার উচ্চ অবস্থায় অধিষ্ঠিত হলে অনেক সময় এই বাস্তবতাকে টের পাওয়া যায় না। কেননা সবাই তাদের কাছে তোষামোদি করেন, দলের প্রতি দেশের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট ও প্রেম দেখানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা যে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ভিতর থেকে দলের শক্তিকেই খর্ব করে ফেলে তা বাইরে থেকে অনেক সময় বোধগম্য হয় না।
এমন পরিস্থিতিতে বিরুদ্ধ পক্ষ অর্থাৎ সরকারবিরোধীরা, এমনকি দেশবিরোধীরাও সুযোগ করে নেওয়ার বা দলীয়ভাবে সংগঠিত হওয়ার এবং শক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পায়। সরকারি দলের পক্ষেও সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সেবা সুচারুভাবে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা ব্যাহত হয়। শাসক দলের নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী দল পরিচালনা এবং দলকে জনবান্ধব হিসেবে ধরে রাখাও ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।
ভূমিধস বিজয় নিয়ে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের অনুসারীদের দৌড় সামলানো, সংঘাত এড়ানো এবং সমন্বিতভাবে সুযোগসমূহের যুক্তিযুক্ত সুনিপুণ বণ্টনের। দল ঠিক রাখতে হলে অনেককেই যেমন অখুশি করা যায় না, তেমনি নানামুখী চাহিদাধারীদের মধ্যে সুসমন্বয় করা একটি জটিল যজ্ঞ। ছোট মাঝারি নেতা কর্মী সমর্থকরা যখন দেখে দুঃসময়ে সকলেই একসাথে ছিল, নির্যাতন নিষ্পেষণ সবকিছু সহ্য করেছে, বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছে, কিন্তু সুসময়ে এসে মুষ্টিমেয় মানুষেরাই শুধু সৌভাগ্যের পরশ পাচ্ছে, তাহলে তাদের মনে না পাওয়ার যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়ে চলবে, ক্ষোভ দানা বাঁধবে।
বর্তমান বাস্তবতায় অনেকেই অনেক আলোকিত আলয়ে সৌভাগ্যের সাহচর্য নিতে দেখা যাচ্ছে। আবার কাউকে কাউকে গাড়ির পেছনে দৌড়াতে, নিরাপত্তাকর্মীদের অথবা নিজ দলের অপেক্ষাকৃত বড় কর্তাদের ধাক্কা খেতে দেখা যাচ্ছে। যেসব নেতা অনেক বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে দৈনন্দিন ওঠা-বসা ও যোগাযোগ রাখতেন, তারা কেউ কেউ সৌভাগ্যবান হাওয়ায় ঐসকল পরিচিত জনের ফোন কল পর্যন্ত ইগনোর করছেন। তারা ভীষণ ব্যস্ত- দেশ জাতির বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে এসবের বিরূপ প্রতিফলন হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই।
সুস্থতা যে কত নিয়ামত এবং অসুখ যে কত যন্ত্রণাময়, তা যেমন সুস্থ অবস্থায় উপলব্ধি করতে হয়; তেমনি অবারিত সুদিন আসলে দুর্দিনের দুরবস্থা এবং অনাহুত অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত আগামীর কথা যথাযথভাবে চেতনায় রাখাটাই জরুরি কাজ হওয়া উচিত।
লেখক : অধ্যাপক (দর্শন বিভাগ), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ড. মো. শওকত হোসেন
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬ । ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ