আজ সাত বছর পূর্ণ হলো—তুমি নেই, তবু সময় ঠিকই বয়ে যায় নিজের নিয়মে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে ভুলে যাওয়া হয়নি, বরং স্মৃতির পলি জমে তোমার অস্তিত্ব যেন আরও ভারী হয়ে বসেছে বুকের গভীরে।
কিছু মানুষ এই পৃথিবীতে জন্ম নেয় অন্যের জন্য বাঁচতে—নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে। তুমি ছিলে ঠিক তেমনই একজন, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
তোমার মায়ার বাঁধনে আমরা সবাই এমনভাবে জড়িয়ে ছিলাম, যেন সেই বন্ধন ছিন্ন হওয়ার নয় কোনোদিনই। আমাদের ছোট্ট পরিবারটাকে তুমি আগলে রেখেছিলে অসীম মমতায়, স্নেহে, আর নির্ভরতার এক নিরাপদ ছায়ায়। আজও মনে হয়, দূর কোথাও বসে তুমি চুপিচুপি আমাদের জন্য আশীর্বাদ করে যাচ্ছো।
নিজে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন না হয়েও শিক্ষার প্রতি তোমার যে অদম্য ভালোবাসা ছিল, তা ভাবলে আজও বিস্মিত হই। তুমি বুঝতে—শিক্ষাই মানুষের প্রকৃত সম্পদ। তাই ছেলেমেয়ের ভেদাভেদ না করে সবার জন্য সমানভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে। তোমার সেই দৃঢ় সংকল্প ছিল পাহাড়সম অটল। শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনের প্রতিটি ধাপে আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তোমার অবদান ছিল নিঃশব্দ অথচ অসীম।
নিজের কোনো আয়ের উৎস না থাকলেও, প্রয়োজনের সময় কোথা থেকে যেন তুমি সব ব্যবস্থা করে ফেলতে। আজও ভাবি—কী করে পারতে তুমি? আমাদের বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে তোমার ত্যাগ, তোমার সংগ্রাম মিশে আছে অদৃশ্যভাবে।
নানাভাই চাকরির কারণে অধিকাংশ সময় বাইরে থাকতেন, কিন্তু সেই অভাব আমরা কখনো টের পাইনি। কারণ তুমি ছিলে—একাই ছিলে এই সংসারের কাণ্ডারি, অতন্দ্র প্রহরী। তোমার অসীম ধৈর্য, সাহস আর ভালোবাসা দিয়ে তুমি সব শূন্যতা পূর্ণ করে রেখেছিলে।
নানু, তুমি কি ভালো আছো?
এখন কি তুমি ওই দূর আকাশের কোনো নক্ষত্র হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকো?
আজ জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে—অনেক কিছুই হাতের নাগালে। তবুও মনে হয়, আমরা যেন ভেতর থেকে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছি। মমতার সেই গভীর বন্ধন, সেই শক্ত মনের জোর—কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি আমরা। অল্প আঘাতেই ভেঙে পড়ি, দিশেহারা হয়ে যাই।
চলে যাওয়ার সময় তুমি কি তোমার সেই অসীম শক্তিটুকু আমাদের দিয়ে যাওনি?
যদি আর একবার তোমাকে কাছে পেতাম, খুব করে বলতাম—আমাদেরও একটু শক্ত করে দাও, তোমার মতো করে বাঁচতে শেখাও।
তোমাকে খুব মনে পড়ে, নানু।
যেখানেই থেকো—ভালো থেকো।
আর যদি সত্যিই নক্ষত্র হয়ে থাকো, তবে তোমার আলোটা যেন আমাদের পথ দেখাতে থাকে সারাজীবন।

আবরাব নাদিম ইতু
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬ । ৯:৩৪ অপরাহ্ণ