রোগমুক্তির বিশ্বাসে ৬০ বছরের ঐতিহ্য—সদরপুরে শীতলা পূজায় কাদামাটির উল্লাস

সদরপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬ । ১:০১ অপরাহ্ণ

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার একটি গ্রামে প্রায় ছয় দশক ধরে চলে আসছে এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ও লোকজ ঐতিহ্য—শীতলা পূজা। হাম, বসন্তসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় প্রতি বছরই এই পূজার আয়োজন করেন স্থানীয়রা।

শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মালোপাড়া গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এ বছরের শীতলা পূজা।

প্রতি বছরের মতো এবারও গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এই পূজায়। সকাল থেকেই গ্রামজুড়ে শুরু হয় প্রস্তুতি, আর বিকেলের দিকে পূজাকে ঘিরে তৈরি হয় এক প্রাণবন্ত উৎসবের আবহ। ঢাক-ঢোলের তালে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা, যেন গ্রামবাসীর আনন্দের বাঁধ ভেঙে যায়।

এই পূজার অন্যতম আকর্ষণ কাদামাটির খেলা। পূজা শেষে গ্রামবাসীরা দলবেঁধে কাদা-মাটিতে নেমে পড়েন এবং আনন্দ-উল্লাসে একে অপরকে কাদা মাখিয়ে উৎসব উদযাপন করেন। ছোট-বড় সবাই এতে অংশ নেন, যা গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য রূপ তুলে ধরে। স্থানীয়দের মতে, এই কাদা খেলা শুধু আনন্দের অংশ নয়, বরং এটি ঐতিহ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, শীতলা দেবীর আরাধনা করলে হাম, বসন্তসহ নানা ধরনের সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এই বিশ্বাস থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই পূজার আয়োজন। গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য, প্রায় ৬০ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা এ অঞ্চলে যখন মহামারির মতো রোগের প্রকোপ দেখেছিলেন, তখনই রোগমুক্তির আশায় শুরু হয় শীতলা পূজা। সময়ের পরিক্রমায় আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হলেও এই ঐতিহ্য থেমে যায়নি।

পূজার দিন গ্রামে তৈরি হয় মিলনমেলা। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরাও এসে যোগ দেন এই আয়োজনে। অনেকেই এটিকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন হিসেবে দেখেন। ভিন্ন মত ও বয়সের মানুষ একত্র হয়ে এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।

স্থানীয়দের মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান রোগ নিরাময়ে বড় ভূমিকা রাখলেও এই পূজা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। তাই ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ঐতিহ্য রক্ষা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য তারা প্রতিবছরই যথাযোগ্য মর্যাদায় শীতলা পূজা উদযাপন করে থাকেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের লোকজ উৎসব গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে এবং নতুন প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাই এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন