প্রকৃতির বিরল ফুল ‘নাগলিঙ্গম’

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ । ৮:০০ পূর্বাহ্ণ

বসন্ত প্রকৃতির প্রায় শেষ সময় এখন। তারপরও দক্ষিণ-হাওয়া দারুণ উতলা! কচি-কিশলয় আর কোকিলের কুহুতানে জেগে উঠেছে বাংলার প্রকৃতি।

নানা রঙের বর্ণছটায় প্রকৃতি যেন নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে। এমন উচ্ছল বসন্তের হাত ধরেই প্রকৃতিকূলে বসেছে ফুলদের মেলা।

বড় আকৃতির গাছের গায়ে শোভা পাচ্ছে হালকা গোলাপি-হলুদ রঙের অপূর্ব এক ফুল। গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ালে এক প্রকারের মৃদু সুগন্ধ হঠাৎ ধেয়ে আসে।

তখনই মন উতলা হয়—সেই সুগন্ধের রহস্য বের করার জন্য!
গাছটির শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে এই মাধুর্যময় পুষ্পশোভা। রঙিন আভা ছড়ানো ফুলগুলোও বেশ বড় বড়।

এই শোভা যেমন আকৃতিতে বড়, তেমনি নয়নাভিরাম। ফুলের পরাগচক্র দেখতে অনেকটা সাপের ফণার মতো। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন ফণা তোলা সাপ! সেই সঙ্গে ওইসব ফুলে ফুলে মৌমাছিদের গুঞ্জন-ধ্বনি অসাধারণ অনুভূতির জন্ম দিয়ে যায়।
চোখজুড়ানো বিশেষ প্রজাতির ফুলটির নাম ‘নাগলিঙ্গম’।

ফুলের লাল পাপড়ির মধ্যেখানটি নাগ বা সাপের মতো ফণা তুলে আছে বলে উদ্ভিদসংশ্লিষ্টরা এর নামকরণ করেছেন নাগলিঙ্গম। নাগলিঙ্গম গ্রীষ্মের ফুল। ফুটতে শুরু করে বসন্তের শেষ থেকে। অনেক দিন ধরে ফোটে, প্রায় শরৎ পর্যন্ত।

চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) ভেতরে প্রস্ফুটিত হয়ে রয়েছে মনমাতানো এই ফুল। ফুল ফোটার পর গাছটিতে ধরে বড় আকৃতির গোলাকার ফল। এর ফল দেখতে কামানের গোলার মতো। সে কারণেই ইংরেজিতে এর নাম ‘ক্যানন বল’। তবে ফল নয়, নাগলিঙ্গম দৃষ্টি কাড়ে তার ফুলের অসাধারণ সৌন্দর্যের কারণে।

নাগলিঙ্গমের সৌন্দর্যে অভিভূত উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা তার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আপনি বর্ণে, গন্ধে, বিন্যাসে অবশ্যই মুগ্ধ হবেন। এমন আশ্চর্য ভোরের একটি মনোহর অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনার মনে থাকবে।’

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার ড. আব্দুল আজিজ বলেন, নাগলিঙ্গম একটি বিরল প্রজাতির বৃক্ষ। এই গাছের ইংরেজি নাম ‘Cannonball Tree’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis, যা Lecythidaceae পরিবারভুক্ত। এর আদি নিবাস আমাজন ও মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার বনাঞ্চল। নাগলিঙ্গম ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গুচ্ছ পাতাগুলো খুব লম্বা, সাধারণভাবে ৮-৩১ সেন্টিমিটার, কিন্তু ৫৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বায় পৌঁছাতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এর আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়। বেশি দেখা মেলে ল্যাটিন আমেরিকায়। হিন্দু ও বৌদ্ধ উপাসনালয়গুলোতে পবিত্র বৃক্ষ মনে করে রোপণ করা হয় নাগলিঙ্গম। গাছের গুঁড়ি ফুঁড়ে বের হওয়া দড়ির মতো এক ধরনের দণ্ডের মঞ্জরিতে ফোটে। ফুলের আকার বেশ বড়। ফুলের পাপড়ি মোটা। লাল, গোলাপি ও হলুদের মিশ্রণ নাগলিঙ্গমকে করেছে আরও আকর্ষণীয়। মার্চ মাসে ফুল ফোটা শুরু হয়। গাছের কাণ্ড ও ডাল থেকে ঝুলন্ত লম্বা লম্বা ডাঁটায় কয়েকটি ফুল ফোটে বছরে কয়েকবার। হালকা গোলাপি-হলুদে মিশ্র রঙের পুংকেশরের একগুচ্ছ ক্ষুদে পাপড়ি।

এর উৎপত্তি এবং ঔষধিগুণ প্রসঙ্গে ড. আজিজ বলেন, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহ আল হোসেন গাছটির চারা রোপণ করেছিলেন। এই ফুলের ঔষধিগুণও রয়েছে। এর ফুল, পাতা ও বাকল থেকে তৈরি ওষুধ নানা ধরনের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

বাংলার প্রকৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যেতে বসেছে এমন বিরল বৃক্ষগুলো সংরক্ষণে বৃক্ষপ্রেমী-ফুলপ্রেমীসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ড. আজিজ।

–বাংলানিউজ 

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন