কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার মনে নানা ধরনের বিচিত্র ছবি ভেসে উঠছে। কিছু পুরোনো সিনেমার চরিত্র, যা শৈশবে দেখেছিলাম। কিছু সাহিত্য বা বিখ্যাত শিল্পকর্মের অংশ। এগুলোর মধ্যে একটি মিল আছে, সেগুলোয় অতিরঞ্জিত, প্রায় অস্বাভাবিক এক ধরনের অশুভ তৎপরতা দেখা যায়।
এ ছবিগুলো যেন বাস্তবের ভয়াবহ দৃশ্যগুলোকে বোঝার চেষ্টা করছে। গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে বের করা মৃতদেহ, ইরানে একটি স্কুলে বোমা হামলায় নিহত শিশুদের ছবি, দক্ষিণ লেবাননে লাখো মানুষের ঘরছাড়া হওয়া। মনে পড়ে যায় এক চলচ্চিত্রের দৃশ্য, যেখানে একজনকে চোখ খোলা রেখে জোর করে সবকিছু দেখানো হচ্ছে, সে চোখ বন্ধ করতে পারছে না।
সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো, এ নির্মমতা কত সহজে ঘটছে, যেন এটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এ মৃত্যু ও বিশৃঙ্খলার মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন উপস্থিতি। তাকে এমন এক চরিত্রের মতো মনে হয়, যে খেলা শুরু করতে চায়; কিন্তু তার পরিণতি নিয়ে ভাবে না।
ট্রাম্পের আচরণকে কোনো নির্দিষ্ট কৌশল বা পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা কঠিন। তার সিদ্ধান্তে নিরীহ মানুষের মৃত্যু এবং পুরো সভ্যতাকে হুমকি দেওয়ার মতো বক্তব্য বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত চিন্তা নেই। তার কাজগুলো অনেক সময় হঠাৎ আবেগ ও ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে আসে।
অনেকে মনে করেন, ট্রাম্পের এই স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অভাব তাকে আগের স্বৈরশাসকদের মতো বিপজ্জনক করে তোলে না। কারণ অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা পরিকল্পিতভাবে কাজ করত। যেমন কেউ কেউ বলেন, কাউকে ফ্যাসিস্ট বলতে হলে তার সেই উদ্দেশ্য থাকতে হবে। তাদের মতে, ট্রাম্প অদক্ষ, অস্থির এবং অনেক সময় বিভ্রান্তিকর, কিন্তু তাকে ফ্যাসিস্ট বলা যায় না।
ট্রাম্প ফ্যাসিবাদের প্রচলিত ধরনও অনুসরণ করেন না। তিনি বড় বড় সমাবেশ করেন না, ইউনিফর্ম পরেন না বা বারান্দা থেকে উত্তেজনামূলক ভাষণ দেন না। তিনি এখনো পুরোপুরি সংবিধান ভেঙে ফেলেননি বা গণতন্ত্র ধ্বংস করেননি। তাকে অনেক সময় এক ধরনের অদ্ভুত, হাস্যকর চরিত্র মনে হয়, যার ভেতরের ভাবনা তার সামাজিক মাধ্যমে রাগী পোস্ট বা এলোমেলো বক্তৃতায় প্রকাশ পায়। তিনি ইরান যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেন বিশাল এক ইস্টার খরগোশের পাশে দাঁড়িয়ে, আবার নিজেকে যিশুর মতো দেখিয়ে ছবি পোস্ট করেন। অনেক সময় বলা হয়, তিনি শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান। যেন এমন এক চরিত্র, যে প্রথমে তাড়া করে, পরে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলে সরে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মন্দ কি আসলে এমনই নয়? বড় কোনো পরিকল্পনা নয়, বরং ছোট মানসিকতা ও ভয়ের প্রতিফলন। সহিংসতার ফল নয়, বরং তা প্রয়োগ করার মধ্যেই যে সন্তুষ্টি পাওয়া যায় সেটাই এখানে মুখ্য। ট্রাম্পের নিজের প্রশংসা করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতি ক্ষোভ, গণমাধ্যমের সমালোচনায় রাগ, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি, সবকিছুই যেন এক ধরনের অপমানবোধ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা।
এ ছোট মানসিকতার মধ্যেই এক ধরনের সীমাহীন অশুভ উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। ১৯৩১ সালে, অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর এক মার্কিন সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার নেন। তিনি পরে লেখেন, প্রথমে মনে হয়েছিল তিনি জার্মানির ভবিষ্যৎ স্বৈরশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার মনে হয়, এ মানুষটি আসলে খুবই তুচ্ছ এবং গুরুত্বহীন।
আরেক সাংবাদিক বেনিতো মুসোলিনিকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, তার ভঙ্গিমা, অঙ্গভঙ্গি এবং ভাষণ অনেক সময় হাস্যকর মনে হতো। কিন্তু এই হাস্যকর দিকটি তাকে কম বিপজ্জনক করে তোলে না। কারণ কোনো কিছু মজার বা অদ্ভুত মনে হলেও, সেটি যে বিপজ্জনক নয়, এমনটা ভাবা ভুল।
আমরা সাধারণত ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে অনেক বেশি গুরুতর ও সুসংগঠিত হিসেবে দেখি, যা বর্তমান সময়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি না। এর কারণ হলো, মানুষের পক্ষে হাস্যকর বা অদ্ভুত রূপে প্রকাশ পাওয়া মন্দকে চিনতে কঠিন লাগে। এভাবেই তা ধীরে ধীরে আমাদের সামনে আসে। তাই আমরা পরে অবাক হয়ে ভাবি, অতীতে এত বড় অপরাধ কীভাবে ঘটতে পারল। আসলে মন্দ খুব কমই স্পষ্ট খলনায়কের রূপ নিয়ে আসে। এটি আসে ভাঙা মানুষের রূপে, যাদের শক্তি থাকে নিজেদের পূর্ণ করার এক অদম্য ইচ্ছায়, পরিণতি যাই হোক না কেন। ট্রাম্পের অদ্ভুত আচরণের পাশাপাশি এ বাস্তবতাও আছে যে, তার হাতে রয়েছে পারমাণবিক ধ্বংসের ক্ষমতা এবং সংঘাত বাড়ানোর প্রবল প্রবণতা।
মন্দের ভেতরে থাকে হালকাভাব, উদাসীনতা এবং ভঙ্গুরতা, আবার একই সঙ্গে থাকে নির্মমতা ও বিরামহীন আগ্রাসন। মনে পড়ে একটি সিনেমার কথা। সেখানে দেখানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যেখানে বছরে এক দিন সব অপরাধ বৈধ। এর উদ্দেশ্য মানুষের ভেতরের ক্ষোভ ও অন্ধকার বের করে দেওয়া, যাতে বছরের বাকি সময় শান্ত থাকে। কিন্তু সেখানে মানুষ শুধু অপরাধ করেই থেমে থাকে না। তারা নানা পোশাক পরে, মুখোশ ব্যবহার করে, গান বাজায় এবং যেন এক ধরনের উৎসবের মতো করে এই সহিংসতা উপভোগ করে।
এই গল্পটি দেখায়, অপরাধ শুধু কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সঙ্গে থাকে এক ধরনের প্রদর্শন। মানুষ যখন বড় অপরাধ করে, তখন সেটিকে তুচ্ছভাবে উপস্থাপন করার মধ্যেই তারা এক ধরনের শক্তি অনুভব করে। কাজটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই স্বাধীনতা বা অনুমতি। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর পদক্ষেপ নয়, সেটিকে উদযাপনের মতো করে উপস্থাপন করাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ ধরনের উল্লসিত নিষ্ঠুরতার সামনে কাউকে খুশি করার চেষ্টা বা মজা নেওয়া কোনো সমাধান নয়। এটিকে ছোট করে দেখা বা বলা যে, এতে কোনো আদর্শ বা কৌশল নেই, তাই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, এমন ধারণাও ভুল। দেশের ভেতরে ও বাইরে যে নির্মমতা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, তা থামাতে হলে শক্তভাবে এবং দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নইলে এটি সবকিছু গ্রাস করে ফেলবে।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার কলামিস্ট। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি

তহমিনা মিলি
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬ । ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ