আমাদের চারপাশে এমন অনেক সফল ব্যক্তিত্ব আছেন যারা খুব সাধারণ বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাদের জীবনদর্শন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার ধরন রুপালি চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো ব্যক্তিদের চেয়ে কিছুটা আলাদা।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শৈশবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা বা অভাব মানুষের মধ্যে এমন কিছু বিশেষ গুণ ও অভ্যাস তৈরি করে, যা তাদের সাফল্যের পথে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণার আলোকে এমন পাঁচটি ক্ষেত্রের কথা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সৃজনশীলতা
সুবিধাবঞ্চিত পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষেরা অল্প সম্পদে সেরা ফল বের করে আনতে শেখেন। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে অভাবের অভিজ্ঞতা মানুষের মস্তিষ্ককে আরও তীক্ষ্ণ এবং সৃজনশীল করে তোলে। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেন এবং বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে পারদর্শী হন। যেখানে অঢেল সুযোগে বড় হওয়া ব্যক্তিরা কোনো সহায়তার অভাবে ভেঙে পড়তে পারেন, সেখানে এই মানুষেরা তাদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে বাধা জয় করেন।
২. ইস্পাতদৃঢ় মানসিক সক্ষমতা
দার্শনিক নিৎশে বলেছিলেন, ‘যা তোমাকে মেরে ফেলে না, তা তোমাকে আরও শক্তিশালী করে।’ শৈশবে প্রতিকূলতা ও প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হওয়া ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হন। ড. সুনিয়া লুথারের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলার মাঝারি মানের প্রতিকূলতা মানুষের মধ্যে ‘স্টিলিং এফেক্টস’ (Steeling Effects) বা মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে। এই অভ্যন্তরীণ শক্তি কোনো অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়; এটি কেবল জীবনের কঠিন সংগ্রাম আর ব্যর্থতা থেকেই অর্জিত হয়।
৩. অন্যের প্রতি অকৃত্রিম সহানুভূতি
কথায় আছে, অন্যের জুতোয় পা না দিলে তার কষ্ট বোঝা যায় না। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া মানুষেরা আর্থিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যান বলে তারা অন্যের দুঃখ-দুর্দশা সহজে অনুভব করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজেরা আর্থিক কষ্টের মুখোমুখি হয়েছেন, তারা অন্যদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল এবং পরোপকারী আচরণ প্রদর্শন করেন।
৪. উচ্চতর আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’
মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন-আর্থসামাজিক পরিবার থেকে আসা ব্যক্তিরা মানুষের আবেগ এবং উদ্দেশ্য বুঝতে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ হন। সম্পদ কম থাকায় অন্যের মনোভাব বুঝে চলা বা অন্যের লুকানো উদ্দেশ্য বুঝতে পারা তাদের কাছে এক ধরনের ‘সারভাইভাল স্কিল’ বা টিকে থাকার কৌশল হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ গুণটি তাদের প্রখর ‘স্ট্রিট স্মার্টনেস’ এবং উচ্চতর ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স দান করে।
৫. কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা ও কর্মনিষ্ঠা
যাদের সবকিছু নিজের যোগ্যতায় অর্জন করতে হয়, কঠোর পরিশ্রম তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। ধনী পরিবারের সন্তানরা পছন্দ অনুযায়ী কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন, কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের কাছে পরিশ্রম ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকে না। এই বাস্তবতাই তাদের কাজের প্রতি এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ তৈরি করে এবং তাদের মধ্যে শক্তিশালী ‘ওয়ার্ক এথিক’ বা কর্মনিষ্ঠা গড়ে তোলে। পরিশেষে বলা যায়, শৈশবের অভাব বা সীমাবদ্ধতা কেবল বাধা নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আরও দক্ষ ও সফল হওয়ার রসদ জোগায়। এই বিশেষ গুণাবলিই তাদের জীবনের দীর্ঘ দৌড়ে জয়ী হতে সাহায্য করে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ । ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ