“জরাজীর্ণ পথ, স্থবির জীবন: অবহেলার তিন দশক পার করছে ফরিদপুর ব্যাপ্টিষ্ট চার্চ মিশন”

আবরাব নাদিম ইতু, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ । ২:১০ অপরাহ্ণ

ফরিদপুর পৌরসভার কেন্দ্রস্থল থেকে মাত্র ৮০০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ফরিদপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ মিশন এলাকা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে কয়েকশত খ্রিষ্টান, সনাতনী ও মুসলিম পরিবারের বসবাস হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে এলাকাটি এখনও রয়ে গেছে অবহেলিত। আধুনিক শহরের মাঝেই এখানে এখনো অর্ধেক ইট ও অর্ধেক কাঁচা রাস্তা দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।

ফরিদপুর জিলা স্কুলের পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীর থেকে শুরু করে ২ নম্বর হাবেলী গোপালপুরের রকিবউদ্দিন সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত এই সড়কটি দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে ইটের সলিং দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। তবে সময়ের সাথে সংস্কারের অভাবে রাস্তার প্রস্থ ১২ ফুট থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৬ ফুটে নেমে এসেছে। এতে করে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরি সেবার বড় যানবাহন প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এলাকাটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। ১৯০৫ সালের দিকে এখানে বসতি গড়ে ওঠে এবং ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যাপ্টিস্ট চার্চ। ১৯৫০ সালে চালু হয় ব্যাপ্টিস্ট চার্চ স্কুল, যার শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। বর্তমানে এলাকাটিতে ‘মধ্য দক্ষিণ শিশু উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। এছাড়া অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘এল বারবার মেমোরিয়াল হোস্টেল’, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ‘টুইঙ্কেল স্পেশালাইজড স্কুল’সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে।

একসময় দক্ষিণবঙ্গের খ্রিষ্টান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেন্টার হিসেবে এলাকাটি বেশ পরিচিত ছিল। এখানে কারিগরি প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ মেরামতের ওয়ার্কশপ এবং ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবাও চালু ছিল। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের সমাধিসহ একটি ঐতিহাসিক কবরস্থান এবং কয়েকটি হেরিটেজ স্থাপনাও রয়েছে এখানে। বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক গুদাম থাকলেও ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এলাকার সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী স্টিভ তুর্য বলেন, “এই এলাকাটি ব্রিটিশ আমলে চার্চ কর্তৃপক্ষ ক্রয় করেছিল। এখন এখানে কয়েকশত পরিবার বসবাস করছে। সবার স্বার্থে দ্রুত রাস্তা পাকা করা জরুরি।”

চার্চের সহ-সম্পাদক পল পিকলু বিশ্বাস জানান, “বর্তমানে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলাই কষ্টকর। ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু হলেও সমন্বয়ের অভাবে সেটিও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও টেকসই রাস্তা এখন সময়ের দাবি।”

সরেজমিনে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বাসাবাড়ির ময়লা পানি সরাসরি পুকুরে গিয়ে পড়ছে। এতে এলাকার তিনটি পুকুরই চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বৃষ্টি হলে রাস্তা কাদায় পরিণত হয়, আর শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। শিশু, নারী ও প্রবীণদের জন্য পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

৯১ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা পিটার এ. কে. বিশ্বাস বলেন, “শৈশব থেকে এই রাস্তার সমস্যা দেখে আসছি। এখন আমার নাতিরাও একই সমস্যায় ভুগছে—এটা খুবই কষ্টের।”

চার্চের সাধারণ সম্পাদক উইলিয়াম কাঞ্জিলাল জানান, “ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকলেও শহরের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক এখনো কাঁচা অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা বহুবার আবেদন করলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।”

এ বিষয়ে ফরিদপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম বলেন, “পৌরসভার আওতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাজের চাপ অনেক বেশি। আমরা ধাপে ধাপে উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। আশা করছি দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের এই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত রাস্তা পাকা করা এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এলাকাটিকে বসবাসযোগ্য করে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন