রাতের গভীর ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেলে অনেকেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন সময়টা রাত ৩টা বা তার কাছাকাছি। এরপর আর সহজে ঘুম আসে না। এপাশ-ওপাশ করতে করতে সকাল হয়ে যায়। পরদিন সারাদিন ক্লান্তি, বিরক্তি আর ঝিমুনিতে কাটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝরাতে বিশেষ করে ভোর ৩টার দিকে ঘুম ভেঙে যাওয়া সবসময় অস্বাভাবিক নয়। তবে এটি যদি নিয়মিত ঘটতে থাকে, তাহলে শরীর ও মনের কিছু সংকেতের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
ঘুমের স্বাভাবিক চক্রের কারণেও হতে পারে
মানুষের ঘুম সাধারণত ৯০ থেকে ১০০ মিনিটের কয়েকটি চক্রে বিভক্ত। প্রতিটি চক্র শেষে ঘুম কিছুটা হালকা হয়। রাতের দ্বিতীয় ভাগে ঘুম আরও হালকা হয়ে যাওয়ায় তখন জেগে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই রাতে আরও আগেও জেগে ওঠেন, কিন্তু তখন গভীর ঘুম থাকায় তা মনে থাকে না। ভোরের দিকে ঘুম হালকা থাকায় মানুষ সেই জেগে ওঠার বিষয়টি বেশি টের পান।
স্ট্রেস ও দুশ্চিন্তা বড় কারণ
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা মাঝরাতের ঘুম নষ্ট করতে পারে। কাজের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কিংবা স্বাস্থ্যগত ভয়; এসব কারণে মস্তিষ্ক রাতে পুরোপুরি বিশ্রামে যেতে পারে না। ফলে রাতের হালকা ঘুমের সময়, বিশেষ করে ভোর ৩টার দিকে ঘুম ভেঙে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে তখন মাথায় নানা চিন্তা ঘুরতে থাকে এবং পুনরায় ঘুমাতে কষ্ট হয়।
কর্টিসল হরমোনের প্রভাব
শরীরের ‘স্ট্রেস হরমোন’ হিসেবে পরিচিত কর্টিসল ভোরের দিকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে শুরু করে, যাতে মানুষ ঘুম থেকে জাগতে পারে। কিন্তু যাদের মানসিক চাপ বেশি বা স্নায়বিক অস্থিরতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই হরমোন আগেভাগেই বেড়ে যেতে পারে। ফলাফল—রাত ৩টা বা তার কাছাকাছি সময়ে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া।
খাবারের অভ্যাসও দায়ী হতে পারে
রাতে ভারী খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত পানি পান, চা-কফি কিংবা অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় গ্রহণ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতের খাবার খুব তাড়াতাড়ি খেলে বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলেও রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গিয়ে মাঝরাতে ঘুম ভাঙতে পারে।
কিছু শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।
বারবার রাতে ঘুম ভাঙার পেছনে কিছু স্বাস্থ্যগত কারণও থাকতে পারে। যেমন—
শ্বাসকষ্ট বা স্লিপ অ্যাপনিয়া
দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা
হৃদরোগজনিত সমস্যা
স্নায়বিক জটিলতা
মেনোপজ বা হরমোনজনিত পরিবর্তন
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের সময় হট ফ্ল্যাশ ও রাতের ঘাম ঘুম ভাঙার কারণ হতে পারে।
ঘুম ভাঙলে কী করবেন?
ভোররাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনেকেই মোবাইল হাতে নিয়ে স্ক্রলিং শুরু করেন। কিন্তু এতে ঘুম আরও দূরে সরে যায়।
বরং বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দেন—
গভীর শ্বাস নিন
শরীরকে বিছানায় শিথিলভাবে ছেড়ে দিন
চোখ বন্ধ করে শান্ত কোনো দৃশ্য কল্পনা করুন
শরীরের বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে শিথিল করার চেষ্টা করুন
সময় দেখার জন্য বারবার ঘড়ির দিকে তাকাবেন না
যদি ১৫-২০ মিনিটেও ঘুম না আসে, তাহলে কিছু সময়ের জন্য বিছানা ছেড়ে শান্ত পরিবেশে বই পড়া বা হালকা রিল্যাক্সেশন করতে পারেন।
ভালো ঘুমের জন্য যেসব অভ্যাস জরুরি
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠা
শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখা
রাতে ক্যাফেইন ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা
দিনের বেলা স্ট্রেস কমাতে মেডিটেশন বা ব্যায়াম করা
ঘুমানোর আগে মোবাইল ও স্ক্রিন টাইম কমানো
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
যদি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়, দিনের কাজে ক্লান্তি দেখা দেয় বা মানসিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অনেক সময় ঘুমের এই সমস্যাই শরীর বা মনের গভীর কোনো সমস্যার প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬ । ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ