‘নিঃশব্দ রাতের সেই নারী’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬ । ৮:২১ অপরাহ্ণ

গভীর রাত। ফরিদপুর রেলস্টেশনের চারপাশে যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এসেছে। দূরের বাতিগুলো মিটমিট করে জ্বলছে, যেন ক্লান্ত চোখে পৃথিবীকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে। শনশন বাতাস ছুটে যাচ্ছে রেললাইনের বুক চিরে। কোথাও কোনো মানুষের শব্দ নেই। শুধু মাঝে মাঝে একটি কুকুরের দীর্ঘ হাহাকার ভেসে আসছে, আর স্টেশনের পুরোনো ছাউনির নিচে কুক চড়ুই পাখিটা অবিরাম ডেকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতিও আজ কোনো অজানা শোকে নিথর হয়ে গেছে।

স্টেশনের এক কোণে ছেঁড়া একটি চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে এক ছিন্নমূল নারী। বয়স কত হবে বোঝা যায় না। দারিদ্র্য আর সময় তার মুখের সমস্ত সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে। এলোমেলো চুল, ক্লান্ত চোখ আর শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট যেন তার জীবনের দীর্ঘ কষ্টের গল্প বলে যাচ্ছে। কেউ তার পাশে এসে বসেনি, কেউ জিজ্ঞেসও করেনি—“মা, তুমি খেয়েছো?”

হয়তো সারাদিন সে স্টেশনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছে একমুঠো খাবারের আশায়। হয়তো কারও কাছে হাত পেতেছিল, কিন্তু ব্যস্ত শহর তাকে দেখেও দেখেনি। এই সভ্য পৃথিবীতে মানুষ আজ বড় বেশি ব্যস্ত, অন্যের কান্না শোনার সময় কোথায়!

হঠাৎ আকাশে মেঘের গর্জন শোনা গেল। কালো মেঘে ঢেকে গেল চারদিক। কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে নারীর মুখে। কিন্তু সে নড়ল না। মনে হচ্ছিল, বৃষ্টি আর তার চোখের অশ্রু একসাথে মিশে গেছে।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্মটা তখন আরও বেশি নিরব হয়ে উঠল। দূরে কোনো ট্রেনের আলো নেই, কোনো মানুষের পদচারণা নেই। শুধু রাত জেগে আছে সেই নারী আর তার না বলা হাজারো কষ্টের গল্প।

কেউ জানে না, ভোর হলে সে আবার জেগে উঠবে কি-না। কেউ জানে না, এই বৃষ্টিভেজা রাত তার জীবনের শেষ রাত কি-না। তবুও পৃথিবী থেমে থাকবে না। ট্রেন চলবে, মানুষ আসবে-যাবে, কিন্তু স্টেশনের সেই নিঃশব্দ কোণে পড়ে থাকবে এক অবহেলিত জীবনের দীর্ঘশ্বাস।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন