ফোন দিয়ে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয় কেন জানতে চাচ্ছে পুলিশ?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ । ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ

রাজধানী ঢাকায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিককে ফোন করে ও বাসায় গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লিংক-আইডি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিদ্যুৎ বিলের কপিসহ ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইছে পুলিশ।

পুলিশের বিশেষ শাখা (সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ-সিএসবি) থেকে চিঠি পাঠানো চিঠির ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত সাংবাদিকদের ফোন করে এমন তথ্য চাওয়া হচ্ছে মাঠ পুলিশের পক্ষ থেকে। অনেকক্ষেত্রে মুঠোফোনেই হুমকি, আক্রমণাত্মক সুরে কথা বলছেন তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পাওয়া সিটিএসবির মাঠ সদস্যরা।

সিটিএসবিতে কর্মরত পুলিশ সদস্য পরিচয়ে ফোন পাওয়া একাধিক সাংবাদিক এমন প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ, নিরাপত্তাহীনতায় ও আতঙ্কিত বলে জানিয়েছেন।

সম্প্রতি পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চের পূর্ব বিভাগের পক্ষ থেকে মতিঝিল, তেজগাঁও, শাহবাগ, সূত্রাপুর, পল্টন ও সবুজবাগ জোন ইনচার্জদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সাংবাদিক ও ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের’ বিস্তারিত তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

চিঠিতে নাম-ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক পরিচিতি, সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কোনো পেশা, পারিবারিক বৃত্তান্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লিংকসহ নানা তথ্য চাওয়া হয়েছে। ঢাকা পোস্টের হাতে এমন একটি চিঠির কপি এসেছে।

এ নিয়ে ফোন পাওয়া, বাসায় গিয়ে পুলিশের তথ্য নেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা বলছেন, রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা একজন সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইতে পারে না। এটি শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থি নয়, বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। পুলিশ সদস্য পরিচয়ে প্রশ্ন করা, তথ্য চাওয়ার ধরনও অপেশাদার, হুমকিস্বরূপ। সরাসরি ফোন করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা জানতে চাওয়া, কেউ কেউ আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।

একটি বহুল প্রচারিত বেসরকারি টেলিভিশনের বিশেষ সংবাদদাতা বলেন, ‘আমাকে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়েছে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না, অতীতে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি কি না। প্রশ্নের ধরন ছিল জিজ্ঞাসাবাদের মতো। এতে আমি আতঙ্কিত বোধ করছি।’

তিনি বলেন, অতীতে অনেক ভিভিআইপি, ভিআইপি অনুষ্ঠান কাভার করেছি। পুলিশ যোগাযোগ করেছে, চা খাওয়ার কথা জানিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছে। কখনো এমন আক্রমণাত্মক, অপেশাদার আচরণ রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি।

সাংবাদিকদের কেউ কেউ বিষয়টিকে ‘ভয়ংকর নজির’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এমন প্রশ্নের সম্মুখীন একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বলেন, যিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, আমি আমার তাকে অফিসে অথবা আমার সাংবাদিক সংগঠনে এসে দেখা করার কথা বললে তিনি বাড়ি/বাসা ছাড়া অন্য কোথাও কথা বলবেন না। সাথে বাসায় যাওয়ার আগে তার চাহিদা অনুযায়ী- এনআইডি, ছবি, বিদ্যুৎ বিলের কপি সংগ্রহে রাখতে বলা হয়।

ওই প্রতিবেদক বলেন, ‘তার ভাষ্য, প্রশ্ন ও তথ্য চাওয়ার ধরণ চরম অপেশাদার। মনে হচ্ছে তিনি অর্ডার করছেন, কখনো মনে হয়েছে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছেন।’

সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চের ফোন পেয়ে অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত কল্লোল। তিনি মিরর এশিয়ার হেড অফ নিউজের দায়িত্বে রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-সহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কর্মকাণ্ড ও ফোরামে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে আসছেন।

তিনি বলেন, আমার ২৫ বছর সাংবাদিকতা জীবনের পুলিশের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন কখনো শুনিনি। এটা ভয়াবহ ব্যাপার যে পুলিশ আমার সঙ্গে আমার বাসায় এসে আমার বাবার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইছেন। এটা পুলিশের এখতিয়ারে পড়ে না। আমিও বলতে বাধ্য নই। আমি সাংবাদিকতার বাইরে অন্য পেশা বা ব্যবসা করি কিনা সেটাও আমি বলতে বাধ্য নই। আমি যদি রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কার্যক্রমে যুক্ত থাকি, সেটা নিয়ে তারা তদন্ত করতে পারে। সেটা তাদের ব্যাপার। খোঁজ নিয়ে শুনতেছি  তিন থেকে সাড়ে তিন-শ’ সাংবাদিককে তালিকা করে এমন অপেশাদার ও হয়রানিমূলক প্রশ্ন করা হচ্ছে। যা সাংবাদিকদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত বলে মনে করি।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের তথ্য তো সংশ্লিষ্ট তথ্য মন্ত্রণালয়ে আছে। তথ্য মন্ত্রণালয় চাইলে হাউজে বা সাংবাদিক সংগঠনের সহায়তা নিতে পারে। সেটা না করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন এটা করছে? এটাকে ভালোভাবে নেওয়া সুযোগ নেই।

একটি ইংরেজি দৈনিকের তিনজনকে ফোন করে একইভাবে তথ্য পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই ইংরেজি দৈনিকের জ্যেষ্ঠ নারী সাংবাদিক বলেন, ‘সাংবাদিকদের কাজই হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম কাভার করা। সেটিকে রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ ভবিষ্যতে হয়রানি বা নজরদারির হাতিয়ার হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয়, এনআইডি কার্ডের কপি চাওয়াটা তো ইতিবাচক কিছু হতে পারে না।

সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা এই পন্থায় সাংবাদিকদের তথ্য চাওয়াকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে ভয়-ভীতির মধ্যে ফেলার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, আমাকেও ফোন করা হয়েছিল। আমি ব্যস্ততার কারণে সাক্ষাৎ করিনি। তবে গতকাল ও আজ শুনছি আমার অনেক সহকর্মীকে ফোন করে রাজনৈতিক পরিচয়, এনআইডির কপিসহ নানা তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এটা কেন করা হচ্ছে? এটা সরকার জানে কিনা? জানলে কি উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে তা কিন্তু স্পষ্ট নয়। আমরা ডিআরইউর পক্ষে জানার চেষ্টা করছি।

তিনি আরও বলেন, এখন একটি রাজনৈতিক নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ছেঁকে ছেঁকে দলীয় নেতাকর্মীদের পুলিশে নিয়েছে। প্রশ্ন: তাদের কেউ এটা করছে কিনা?

তবে সরকারের সৎ উদ্দেশ্য যদি থাকেও সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয়, এনআইডি, বিদ্যুৎ বিলের কপি কেন চাওয়া হবে? এটা তো হতে পারে না। সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতেই পারে। কিন্তু রাজনীতি করার সুযোগ নেই। যিনি রাজনীতিবিদ তিনি সাংবাদিক নন। এটাকে কেন এক করে দেখা হচ্ছে সেটাও ভাববার ব্যাপার।

তিনি বলেন, ‘সরকার বা পুলিশের যদি এখানে নেতিবাচক কোনো উদ্দেশ্য থাকে তাহলে অতীতের ন্যায় সদস্যসহ সাংবাদিকদের সুরক্ষায় ডিআরইউ প্রতিবাদ জানাবে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া বলেন, এটা তো ভালোভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটা নিয়ে কথা বলতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে পরিপত্র জারি করবে, অফিসে ফরম দেবে। সেটা পূরণ করার বিষয়। কিন্তু বিশেষ সংস্থা থেকে সাংবাদিকদের ফোন করা, বাসায় গিয়ে ইন্টারভিউ, তথ্য নেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার সুযোগ নেই।

সাংবাদিকরা নীতি নৈতিকতা মেনেই সাংবাদিকতা করেন। আমরা দক্ষতা পরিচয় দিয়েই কাজ করি। কিন্তু পুলিশের এমন কর্মকাণ্ডে আমাদের অনেক সহকর্মী ভীতসন্ত্রস্ত। আমি মনে করি, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকির কোনো কিছুই শুভকর নয়। সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয় সেটি দেখবেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের এ পদক্ষেপ কর্তৃত্ববাদী আমল কেন, কুখ‍্যাত নাৎসিবাদি বা উত্তর কোরীয় স্বৈরতান্ত্রিক চর্চাকেও ম্লান করে করে দিয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতা, ভিন্নমত, মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চা এবং চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, যা বাংলাদেশের সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশন যেখানে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে, তা স্বৈরাচারী কায়দায় পদদলিত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘যেভাবেই ব‍্যখ‍্যা করা হোক না কেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও অভীষ্ট এবং বিশেষ করে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও সরকারের গঠনের পর মুক্তগণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক চর্চাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের যেসব অঙ্গীকার সরকার দেশবাসীকে শুনিয়েছে বা এখনও শুনিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।’

তিনি আরও বলেন, এ উদ্যোগ যদি সরকারের নির্দেশে বা সরকারের সম্মতি বা অনাপত্তি সাপেক্ষে হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার কী পতিত সরকারের আমলের শাসনব্যবস্থার চেয়ে বেশি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন পরিচালনার মাধ্যমে দেশে একচ্ছত্র রাজনৈতিক ভুবন প্রতিষ্ঠার অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হতে চাইছে। সরকার কী এর মাধ্যমে এই বার্তা দিতে চায় যে কর্তৃত্বপরায়ণ আচরণের বিবেচনায় তারা পতিত সরকারের চেয়ে বেশি পারদর্শী? আমরা আশা করতে চাই সরকারের বোধোদয় হবে এবং এ ধরনের আত্মঘাতী পথ থেকে সরে এসে এ সিদ্ধান্তের পেছনে যারা দায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।’

যদিও ভিভিআইপিদের অনুষ্ঠানের খবর সংগ্রহ বা প্রচার, কাভারেজে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের সম্পর্কে এমন তথ্য সংগ্রহ, তথ্য হাল নাগাদের জন্য সাধারণ নির্দেশনা দিয়ে থাকে পুলিশ সদর দপ্তর।

ঢাকার ক্ষেত্রে যা বাস্তবায়ন করে সিটিএসবি। তবে এজন্য সাংবাদিকদের ফোন করে তথ্য চাওয়ার নজির নেই বলে জানিয়েছেন সিটিএসবির একজন কর্মকর্তা।

তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এমনটি হওয়ার কথা না। মাঠ পর্যায়ে এমন তথ্য গোপনেই চেয়ে থাকে সরকার। সেটা গোয়েন্দা কার্যক্রমেই সংগ্রহ করে জানানোর নিয়ম। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কোনো এসবি সদস্য যদি সাংবাদিকদের ফোন করে তথ্যগুলো চান, অথবা বাড়ি বাড়ি গিয়েও চান, তা দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, এমনটি হওয়ার কথা না। তবুও খোঁজ নিচ্ছি। যদি কেউ এমনটি করে থাকেন তাহলে নির্দেশনা বুঝতে ভুল। বিষয়টি আবার নোটিশ করা হচ্ছে।

সূত্র : ঢাকা পোস্ট

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন