রাত তখন গভীর। ঢাকার পল্লবীর আকাশে ঝুলে ছিল একরাশ কালো মেঘ। চারদিকে নিস্তব্ধতা। রাস্তার বাতিগুলোও যেন কাঁপছিল ভয়ে। সেই রাতেই ছোট্ট রামিসা হারিয়ে যায়। রামিসা ছিল এক ফুটফুটে শিশু। তার হাসিতে ভরে উঠতো পুরো মহল্লা। ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে বেড়াতো গলির একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। মা ডাকলে মিষ্টি কণ্ঠে বলতো, “এই তো আসছি আম্মু!” তার ছোট্ট চোখে ছিল হাজার স্বপ্ন। একদিন ডাক্তার হবে, গরিব মানুষকে চিকিৎসা দেবে, মায়ের জন্য লাল শাড়ি কিনবে, বাবার জন্য পাঞ্জাবি আনবে। কিন্তু মানুষরূপী এক পশু সব স্বপ্ন শেষ করে দিল।
সোহেল রানা—নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নৃশংস অন্ধকার। যে শিশুর নিষ্পাপ মুখ দেখেও থামেনি। যার হৃদয়ে ছিল না কোনো মায়া, ছিল না মানবতা। সেদিন বিকেলে রামিসা খেলছিল বাড়ির সামনে। হাতে ছিল একটি ভাঙা পুতুল। পুতুলটার নামও দিয়েছিল সে—“মিনি”। বন্ধুদের সাথে খেলতে খেলতে কখন যে দূরে চলে যায়, কেউ খেয়াল করেনি। মা ভেবেছিলেন একটু পরই ফিরে আসবে। কিন্তু সন্ধ্যা নামলো, আজানের ধ্বনি ভেসে এলো, তবুও রামিসা ফিরলো না। মায়ের বুক কেঁপে উঠলো। তিনি ছুটলেন গলির পর গলি। প্রতিটি দরজায় কড়া নেড়ে বললেন, “আমার মেয়েকে দেখেছেন?” কেউ দেখেনি। কেউ জানেনি। চারদিকে শুধু আতঙ্ক।
রাত বাড়তে লাগলো। বাবার চোখে তখন ভয়। কাঁপা গলায় তিনি বললেন, “আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন।” মানুষ খুঁজতে বের হলো। মাইকিং হলো। পুলিশ এলো। পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠলো কান্নায়। তারপর এলো সেই ভয়ংকর মুহূর্ত। একটি নির্জন স্থানে পাওয়া গেল ছোট্ট রামিসাকে—নিথর, নীরব, রক্তাক্ত। চারপাশে তখন মানুষের আর্তনাদ। মায়ের চিৎকারে আকাশ ভারী হয়ে গেল। তিনি মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বলছিলেন, “একবার চোখ খোল মা!” কিন্তু রামিসা আর চোখ খোলেনি। যে শিশুটি একটু আগেও হাসছিল, সে এখন সাদা কাপড়ে মোড়ানো।
পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লো ক্ষোভ। মানুষ লিখলো—“এই হত্যার বিচার চাই।” স্কুলের শিশুরাও কেঁদেছে। মায়েরা সন্তানকে বুকে চেপে ধরেছে। বাবারা আতঙ্কে কেঁপে উঠেছেন। কারণ রামিসা শুধু একটি নাম নয়, রামিসা ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর প্রতিচ্ছবি। এরপর গ্রেফতার হলো সোহেল রানা। পুলিশের হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। চোখে কোনো অনুতাপ ছিল না, ছিল না অপরাধবোধ। মানুষ তার ছবি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়লো। সবাই বললো, “এমন মানুষ বাঁচার অধিকার হারিয়েছে।”
আদালতে নেওয়া হলো তাকে। সেখানে সে নিজের দায় স্বীকার করলো। জবানবন্দিতে বেরিয়ে এলো ভয়ংকর সত্য। আদালত কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেকের চোখে জল ছিল। কেউ মাথা নিচু করে কাঁদছিলেন। একজন বৃদ্ধ বললেন, “শিশুরা যদি নিরাপদ না থাকে, তবে সমাজ বেঁচে থাকে কিভাবে?” একজন মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আজ রামিসা গেছে, কাল আমার সন্তানও যেতে পারে।” মানুষ রাজপথে নেমে এলো। মানববন্ধন হলো। মিছিল হলো। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—“রামিসার হত্যাকারীর ফাঁসি চাই।” কেউ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, কেউ মোমবাতি জ্বালিয়েছিল, কেউ চুপচাপ চোখ মুছছিল।
একটি ছোট শিশু মায়ের হাত ধরে জিজ্ঞেস করেছিল, “আম্মু, আপুটাকে কেন মেরে ফেললো?” মা উত্তর দিতে পারেননি। শুধু শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে কেঁদেছেন। রামিসার ঘর এখন নিস্তব্ধ। তার বইগুলো টেবিলে পড়ে আছে। স্কুলব্যাগে এখনও খাতা রাখা। খাতার পাতায় আঁকা ছোট্ট ফুল। মা প্রতিদিন সেই খাতা খুলে দেখেন, কাঁদেন, আবার বন্ধ করেন। রাতে তিনি এখনও মেয়ের কণ্ঠ শুনতে পান। মনে হয় রামিসা বলছে, “আম্মু, আমি এসেছি।” কিন্তু দরজা খুললে কেউ থাকে না।
বাবা আর আগের মতো কথা বলেন না। চুপচাপ বসে থাকেন। মেয়ের পুরোনো জামা হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। একদিন তিনি বললেন, “আমার মেয়ের কী অপরাধ ছিল?” কেউ উত্তর দিতে পারেনি। পল্লবীর সেই গলি আজও রামিসাকে খোঁজে। যেখানে সে খেলতো, যেখানে সে হাসতো। শিশুরা এখন সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরে যায়। মায়েরা আতঙ্কে দরজা বন্ধ করে রাখেন। কারণ একটি ঘটনা পুরো সমাজকে বদলে দিয়েছে।
সোহেল রানার বিচার চেয়ে মানুষ এখনও সোচ্চার। কারণ তারা জানে—এই বিচার শুধু রামিসার জন্য নয়, এই বিচার প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তার জন্য। যখন আদালতে বিচার শুরু হয়, মানুষ টিভির সামনে বসে খবর দেখেছে। প্রতিটি আপডেট শুনেছে। প্রতিটি তথ্য শুনে কেঁপে উঠেছে। একজন শিক্ষক বললেন, “যে শিশুদের ভালোবাসতে শেখেনি, সে মানুষ হতে পারে না।” একজন কবি লিখলেন—“রামিসার কান্না রাত জাগে।” একজন সাংবাদিক লিখলেন—“এই হত্যাকাণ্ড আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”
মানুষ বিচার চায়। দ্রুত বিচার। দৃষ্টান্তমূলক বিচার। কারণ দেরি মানে অপরাধীদের সাহস বাড়ানো। রামিসার কবরের পাশে প্রায়ই মানুষ যায়। ফুল রেখে আসে। দোয়া করে। এক বৃদ্ধা সেখানে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহ, আর কোনো মায়ের কোল খালি কইরেন না।” বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছিল। ছোট্ট একটি জীবন, কত স্বপ্ন ছিল, কত আশা ছিল—সব শেষ হয়ে গেল নির্মমতার কাছে।
সোহেল রানার ছবি আজ মানুষের ঘৃণার প্রতীক। মানুষ তার দিকে তাকিয়ে অভিশাপ দেয়। কারণ সে শুধু একটি শিশুকে হত্যা করেনি, সে হত্যা করেছে মানবতাকে। রামিসার মা এখনও মাঝরাতে জেগে ওঠেন। মনে হয় মেয়ে পানি চাইছে। তিনি দৌড়ে যান। তারপর মনে পড়ে—রামিসা আর নেই। এই শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবে না।
একটি শিশুর হাসি হারিয়ে গেছে। একটি পরিবারের পৃথিবী ভেঙে গেছে। একটি সমাজ লজ্জিত হয়েছে। তবুও মানুষ আশায় বুক বাঁধে। বিচার হবে। অপরাধীর শাস্তি হবে। যাতে আর কোনো রামিসাকে এভাবে হারাতে না হয়। আজও পল্লবীর আকাশে রাত নামলে মানুষ সেই ঘটনার কথা মনে করে। কেউ চুপ হয়ে যায়, কেউ চোখ মুছে। আর দূরে কোথাও যেন ভেসে আসে এক শিশুর কান্না—“আমাকে বাঁচাও…”
রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার স্মৃতি বেঁচে থাকবে। তার জন্য মানুষের ভালোবাসা বেঁচে থাকবে। তার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি বেঁচে থাকবে। যতদিন এই দেশের মাটিতে শিশুরা হাসবে, ততদিন মানুষ রামিসার কথা মনে রাখবে। আর বলবে—“শিশু হত্যাকারীদের কোনো ক্ষমা নেই।”
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬ । ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ