ঢাকার পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যার পর যখন তার বাবা কাঁদতে কাঁদতে বললেন—“বিচার চাই না। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। পারার রেকর্ড নাই।” তখন সেটি শুধু একজন অসহায় পিতার আর্তনাদ ছিল না; এটি ছিল পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থার নগ্ন প্রকাশ।
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সংকট সম্ভবত অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা নয়—সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সংকট হলো মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। মানুষ আর মনে করে না যে অপরাধের বিচার হবে। বরং তারা ধরে নেয়, কিছুদিন আলোচনা হবে, সামাজিক মাধ্যমে ঝড় উঠবে, টেলিভিশনে টকশো হবে, তারপর সব থেমে যাবে। নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে চাপা দিয়ে দেবে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতা একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার পেছনে শুধু রাজনীতি বা প্রশাসন নয়—মিডিয়ারও বড় দায় রয়েছে।
কারণ মিডিয়া কেবল সংবাদ পরিবেশন করে না; মিডিয়া সমাজের চিন্তা, ক্ষোভ ও নৈতিক অবস্থানও নির্ধারণ করে। কোন ঘটনা নিয়ে মানুষ উত্তেজিত হবে, কতদিন ক্ষুব্ধ থাকবে, কোন প্রশ্নগুলো সামনে আসবে—এসবের বড় অংশই নির্ভর করে মিডিয়ার উপস্থাপনার ওপর। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ গণমাধ্যম ভয়াবহ অপরাধকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংকট হিসেবে না দেখে “সংবাদ-ইভেন্ট” হিসেবে ব্যবহার করে।
একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, নির্মমভাবে খুন হয়। কয়েকদিন ধরে শিরোনাম হয়, কান্নাভেজা ভিডিও ছড়ায়, ফাঁসির দাবি ওঠে, মানববন্ধন হয়। তারপর?
তারপর ক্যামেরা সরে যায়। আলো নিভে যায়। কিন্তু যে সমাজ, রাজনীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা এমন দানব তৈরি করেছে, সেটি আগের মতোই বহাল থাকে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—মিডিয়ার বড় একটি অংশ এখন আর পুরোপুরি জনগণের কণ্ঠস্বর নয়; বরং রাজনৈতিক ও করপোরেট স্বার্থের সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে অনেকেই নরম, আবার রাজনৈতিক সুবিধা পেলে একই মিডিয়া উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে। ফলে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে একটি নিরপেক্ষ, ধারাবাহিক ও নৈতিক অবস্থান কখনোই গড়ে ওঠে না।
এ কারণেই “সোহেল রানা”রা হঠাৎ জন্ম নেয় না। তারা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের দায়মুক্তি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্বল বিচারব্যবস্থার ভিতরে। ছোট অপরাধ করে পার পেতে পেতেই একসময় তারা ভয় হারিয়ে ফেলে। আর সমাজ হারিয়ে ফেলে প্রতিরোধের শক্তি।
বাংলাদেশে বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় প্রথমদিকে ব্যাপক আলোচনা হলেও সময়ের সঙ্গে সেগুলোর বিচার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় কিংবা মানুষের মনোযোগের বাইরে চলে যায়। অনেক ঘটনায় বছরের পর বছর কেটে গেলেও রায় কার্যকর হয় না। এতে সাধারণ মানুষের মনে একটি স্থায়ী ধারণা জন্মেছে—“এই দেশে ক্ষমতা থাকলে বিচার এড়ানো সম্ভব।”
আর এই ভয়ঙ্কর মানসিকতা সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ মানুষ যখন বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তখন আইন নয়—ক্ষোভ, প্রতিশোধ ও হতাশা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
মিডিয়ার আরেকটি বড় সংকট হলো ভুক্তভোগীর কান্নাকে পণ্যে পরিণত করা। অনেক ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতার বদলে প্রতিযোগিতা চলে—কার ভিডিও বেশি ভাইরাল হবে, কার শিরোনাম বেশি আবেগ তৈরি করবে। অথচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল কাজ হওয়া উচিত ছিল—অপরাধের সামাজিক ও রাজনৈতিক শেকড় খুঁজে বের করা, বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং ক্ষমতার দায় তুলে ধরা।
শুধু “ফাঁসি চাই” শিরোনাম দিয়ে সমাজ বদলায় না। সমাজ বদলাতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক জবাবদিহি, শক্তিশালী তদন্ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম।
আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একজন বাবা কেন রাষ্ট্রকে সামনে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হন,
“আপনারা পারবেন না”?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালত বা পুলিশের কাছে নেই; উত্তর খুঁজতে হবে রাজনীতি, প্রশাসন, সমাজ এবং মিডিয়ার ভেতরেও।
কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা অস্ত্র নয়, আইন নয়—মানুষের বিশ্বাস। আর বাংলাদেশে সেই বিশ্বাসটাই আজ সবচেয়ে বেশি।
লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক, ফরিদপুর।

এহসানুল হক মিঞা
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ । ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ