খালি পায়ে শহরের অলিগলি, হাট-বাজার আর জনসমাগমের ভিড়ে ঘুরে বেড়ানো এক নারী। জীর্ণ শাড়ি, কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ, এলোমেলো চুল—দেখলে অনেকেই তাকে ভবঘুরে ভাবেন। কিন্তু সেই নারীই যখন মঞ্চে উঠে গেয়ে ওঠেন নজরুলের গান, তখন মুহূর্তেই থমকে যায় পুরো আয়োজন। কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হন উপস্থিত অতিথি, সংস্কৃতিকর্মী, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাখো দর্শকও।
ফরিদপুর শহরে তিনি পরিচিত ‘লাইলি খালা’ নামে। রবিবার (২৫ মে) বিকেলে নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই মঞ্চে উঠে গান পরিবেশন করেন তিনি। আমন্ত্রিত শিল্পীদের বাইরেও তার গান যেন হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ।
জীর্ণ পোশাকে, বিন্দুমাত্র জড়তা ছাড়া তিনি গেয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান—
“নয়নভরা জল গো তোমার…”
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল না মঞ্চসুলভ চাকচিক্য। কিন্তু ছিল এক ধরনের গভীর আবেগ, যা মুহূর্তেই ছুঁয়ে যায় দর্শকদের হৃদয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে মোবাইল ফোনে তার গান ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এরপর থেকেই ফেসবুকজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। অসংখ্য মানুষ ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন নিজেদের মুগ্ধতার কথা। কেউ বলেছেন, “এমন কণ্ঠ অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে।” আবার কেউ লিখেছেন, “এই নারী প্রমাণ করে দিলেন, শিল্প কখনও পোশাক বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন জানান, লাইলি খালার সঙ্গে তার পরিচয় আজকের নয়। ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি যখন শিল্পকলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলেন, তখন প্রায়ই এই নারীকে সেখানে আসতে দেখতেন।
তিনি বলেন, “লাইলি খালা সাহায্যের জন্য আসতেন। কিন্তু একদিন তার গান শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। অসাধারণ সুর আর কণ্ঠ ছিল তার মধ্যে। পরে শিল্পকলায় যারা গান শেখাতেন, তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। তিনি খুব অল্প সময়েই হারমোনিয়াম বাজানোও শিখে ফেলেন।”
মফিজ ইমাম মিলন আরও বলেন, “তিনি নিয়মিত শিল্পকলায় এসে চুপচাপ বসে থাকতেন। গান শুনতেন। কখনও কখনও নিজেও গাইতেন। নূরজাহান, লতা মঙ্গেশকর কিংবা মেহেদী হাসানের গান এমন আবেগ দিয়ে গাইতেন যে, না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন।”
লাইলি খালার জীবন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা গল্প। জানা যায়, এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী হলেও বহু বছর আগে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সন্তানদের সংসার হয়েছে, তারা নিজেদের মতো জীবনযাপন করছেন। কিন্তু লাইলি আর ফেরেননি সংসারে।
ফরিদপুর শহরের মানুষ জানান, তাকে প্রায়ই দেখা যায় একা একা হাঁটতে। কখনও রেলস্টেশন, কখনও বাজার, কখনও নদীর ঘাট—যেখানে মানুষ, সেখানেই যেন তার গন্তব্য।
কেন এভাবে ঘুরে বেড়ান—এ প্রশ্নের জবাবে একদিন মফিজ ইমাম মিলনকে লাইলি খালা বলেছিলেন, “আমি মানুষ দেখি। দুনিয়ায় কত রকমের মানুষ। কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার খুব ভাল্লাগে।”
স্থানীয়দের দাবি, লাইলি খালার জীবনযাপন রহস্যে ঘেরা। অনেকে বলেন, তিনি মাঝেমধ্যেই হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান। পরে আবার ফিরে আসেন। এমনও কথিত আছে, কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়াই তিনি নাকি হেঁটে হেঁটে আজমীর শরীফ পর্যন্ত চলে যান। যদিও এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি, তবুও তার জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।
সম্প্রতি ফরিদপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের ২ এপ্রিল “ফরিদপুর হেরিটেজ” শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান তিনি। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহসহ বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। সেদিনও তার গানের আবেগে মুগ্ধ হয়েছিলেন অতিথিরা।
এর ধারাবাহিকতায় নজরুল জয়ন্তীর আয়োজনেও বিশেষভাবে ডাক পান তিনি।
অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ফরিদপুরের ঐতিহাসিক “ময়েজ মঞ্জিল”-এ। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই ভবনে একসময় এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও। সেই ঐতিহাসিক পরিবেশেই নজরুলের দুটি গান পরিবেশন করেন লাইলি খালা। তার কণ্ঠে যেন ফিরে আসে পুরনো বাংলার আবেগ আর হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির গন্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর নিচে শত শত মন্তব্য জমা পড়েছে। একজন লিখেছেন, “দারিদ্র্য মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে, কিন্তু প্রতিভাকে মুছে দিতে পারেনি।”
আরেকজন লিখেছেন, “এই কণ্ঠে শুধু গান নেই, আছে জীবনবোধ, আছে দীর্ঘ কষ্টের ইতিহাস।”
সংস্কৃতিকর্মীদের অনেকে মনে করছেন, সমাজের অগোচরে এমন বহু প্রতিভা ছড়িয়ে আছে, যাদের সামনে আনার উদ্যোগ খুব কম। লাইলি খালার ভাইরাল হওয়া ঘটনা হয়তো সেই অবহেলিত শিল্পীদের নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ, নাট্যকার ও শিক্ষক ড. অনুপম হায়াৎ, প্রবীণ সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ বদিউজ্জামান চৌধুরী, ফরিদপুর ফাউন্ডেশনের গোলাম মহিউদ্দিন মুন্না এবং জেলা জিয়ামঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজসেবক প্রফেসর এম এ সামাদ।
ফরিদপুরবাসীর কাছে লাইলি খালা নতুন কেউ নন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সারা দেশের মানুষের কাছে। জীবনের সমস্ত অভাব, অবহেলা আর অগোছালো বাস্তবতার মাঝেও তিনি যেন প্রমাণ করলেন—শিল্প কখনও হারিয়ে যায় না। সুযোগ না পেলেও সত্যিকারের প্রতিভা একদিন না একদিন ঠিকই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬ । ৪:৫৪ অপরাহ্ণ