যে কণ্ঠকে অবহেলা করা হয়েছিল, আজ তার জন্যই ভালোবাসার ঢল!

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬ । ৭:৪৪ পূর্বাহ্ণ

লাইলী খালা গ্রামের এক কোণে থাকতেন। ভাঙা ঘর, পুরোনো কাপড় আর অভাবের সঙ্গে ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের সখ্য। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল একটি কণ্ঠ—যে কণ্ঠে মিশে থাকত নদীর স্রোত, শিউলি ফুলের ঘ্রাণ আর বাংলার মাটির মায়া।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি হাটের পাশে বসে নজরুল সংগীত গাইছিলেন। মানুষ পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ শুনছিল না। কেউ ব্যস্ত মোবাইলে, কেউ বাজারের ব্যাগ হাতে। গান শেষ হলেও হাততালির শব্দ শোনা যায়নি। লাইলী খালা শুধু মুচকি হেসে নিজের পথ ধরেছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর গান শোনার মতো সময় কারও নেই।

কয়েকদিন পর এক তরুণ তাঁর গানের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করল। রাতারাতি ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ল দেশজুড়ে। হাজার হাজার মানুষ তাঁর কণ্ঠের প্রশংসা করল। সংবাদমাধ্যম এল, বড় বড় মানুষ এল, ফুলের তোড়া এল, সম্মাননা এল।

যারা একসময় তাঁর পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যেত, তারাই এখন ছবি তুলতে ভিড় জমায়। যারা কখনো তাঁর দিকে ফিরেও তাকায়নি, তারাই আজ তাঁকে “জাতীয় সম্পদ” বলে পরিচয় দেয়। লাইলী খালার কুঁড়েঘরে আজ অতিথিদের আনাগোনা লেগেই থাকে।

কিন্তু এক সন্ধ্যায়, গ্রামের পুরোনো বটগাছের নিচে বসে লাইলী খালা নিঃশব্দে বললেন, “আমার গান তো আজকের না। এই একই গান আমি বহু বছর ধরেই গাইছি। শুধু মানুষগুলো তখন শুনতে চায়নি।”

তাঁর চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করে উঠল। সেই জল ছিল না আনন্দের, ছিল এক দীর্ঘ অবহেলার ইতিহাস।

আমরা হয়তো মানুষকে মূল্য দিতে শিখি তখনই, যখন পৃথিবী তাকে মূল্য দিতে শুরু করে। অথচ সত্যিকারের রত্নগুলো ভাইরাল হওয়ার আগেই রত্ন থাকে।

লাইলী খালার গল্প শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের আয়না, যেখানে কদর আসে আলোচনার পরে, কিন্তু ভালোবাসা আসা উচিত ছিল অনেক আগেই।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন