ইসলামে পুত্রবধূ ও শাশুড়ির সম্পর্ক

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬ । ২:২৭ অপরাহ্ণ

রাসুল (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সমাজে রান্নাবান্নার কাজ নারীরাই সম্পন্ন করতেন। রাসুল (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রী-কন্যারাও ঘরের কাজ নিজেরাই করতেন।

বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুল (সা.) ঘরের কাজে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করতেন। তাঁর পবিত্র স্ত্রী-কন্যারাও ঘরের কাজ নিজেরাই সম্পাদন করতেন।

ফাতেমা (রা.) নারীদের আদর্শ

আদরের প্রিয় কন্যা ফাতেমা (রা.)-কে প্রিয় নবী (সা.) স্বামীগৃহে পাঠানোর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কাজ ভাগ করে দিয়ে বলেছিলেন, ঘরের ভেতরের কাজ স্ত্রী করবে আর বাইরের কাজ করবে স্বামী। (যাদুল মাআদ : ৫/১৬৯)

হাদিসে আছে, বারবার আটা পিষতে গিয়ে ফাতেমা (রা.)-এর হাতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল।

এ কারণে আলী (রা.)-এর কষ্ট হচ্ছিল। তাই তিনি কোনো সেবিকা পাওয়া যায় কি না, সে জন্য প্রিয়তমা স্ত্রীকে রাষ্ট্রপ্রধান পিতা রাসুল (সা.)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন।
ফাতেমা (রা.) সে উদ্দেশে পিতার কাছে গেলেও মুখ ফুটে তা ব্যক্ত করতে পারেননি। পরে রাসুল (সা.) বিষয়টি জেনে নিজেই মেয়ে-জামাতার কাছে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেন।

রাসুল (সা.) বললেন, ফাতেমা! যতক্ষণ পর্যন্ত মদিনার প্রতিটি মানুষ সেবাদাস না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুহাম্মদের (সা.) কন্যাকে কোনো সেবিকা দেওয়া আমি পছন্দ করি না। তোমাকে কি আমি এর চেয়েও উত্তম কিছু দেব? ফাতেমা (রা.) বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, রাতে যখন তোমরা ঘুমোতে যাবে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। তা তোমাদের জন্য সেবিকার চেয়েও উত্তম হবে। (বুখারি, হাদিস: ৩১১৩)

শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা

শ্বশুর-শাশুড়ি ও ঘরের অন্যান্যদের সেবা স্ত্রীর অতিরিক্ত একটি কাজ। এটি তার ফরজ দায়িত্ব নয়। তবে বর্তমান সমাজে অনেক ক্ষেত্রে এটিকে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, যা সঠিক নয়। অনেক জায়গায় ছেলের জন্য বউ আনা হয় শ্বশুর-শাশুড়ির সেবার জন্য-এ ধরনের ধারণা ন্যায্যতা ও ভারসাম্যবোধের পরিপন্থী।

কারণ, মা-বাবার সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব; পুত্রবধূর নয়। (আল-বাহরুর রায়েক : ৪/১৯৩; কিফায়াতুল মুফতি : ৫/২৩০)

তবে স্বামীর মা-বাবার প্রয়োজন হলে তাদের সেবা-যত্ন করা স্বামীর দায়িত্ব। কোনো স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করেন, তা তার জন্য নেকির কাজ এবং সওয়াবের কারণ।

শ্বশুর-শাশুড়ি ও পুত্রবধূ পারস্পরিক সম্পর্ক

স্বামীর মা-বাবাকে নিজের মা-বাবার মতো সম্মান করা এবং তাদের প্রতি সদাচরণ করা স্ত্রীর নৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে শ্বশুর-শাশুড়িরও উচিত পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ-ভালোবাসা দেওয়া এবং তার সুখ-সুবিধার প্রতি যত্নবান হওয়া।

যৌথ পরিবারে পুত্রবধূদের শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করার প্রচলন দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি। অনেক ক্ষেত্রে আলাদা বাসায় থাকলেও পুত্রবধূরা শ্বশুর-শাশুড়ির খোঁজখবর নেন, যা পারস্পরিক ভালোবাসারই প্রকাশ।

সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এ ধরনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। কাবশা বিনতে কাব (রা.) ছিলেন আবু কাতাদা (রা.)-এর পুত্রবধূ। তিনি বর্ণনা করেন, একবার আবু কাতাদা (রা.) ঘরে প্রবেশ করে অজুর পানি চান। তখন কাবশা (রা.) নিজ হাতে তাকে পানি ঢেলে দেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ৭৫)

আবার পুত্রবধূর সন্তান জন্ম নিলে দাদা-দাদি নাতি-নাতনিদের আদর-যত্ন করেন। যদিও এটি তাদের আইনগত দায়িত্ব নয়, তবুও মানবিক ও নৈতিক দায়বোধ থেকেই তারা তা করে থাকেন।

শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক কোনো নতুন বিষয় নয়; মানবসভ্যতার শুরু থেকেই এই সম্পর্ক বিদ্যমান। কোরআন ও সুন্নাহ বিভিন্ন সম্পর্কের সীমা, দায়িত্ব ও নৈতিকতা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এসব সম্পর্ক সঠিকভাবে লালন করা ধর্মীয় ও মানবিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন