রাতের অনন্ত মহাকাশে যদি কোটি কোটি নক্ষত্র একে অপরকে উপেক্ষা করে কেবল নিজ নিজ কক্ষপথে পাথরের মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তবে সেই বিশালতা আর মহাবিশ্ব থাকতো না; তা পরিণত হতো প্রাণহীন নিথর রঙ্গমঞ্চে। সেখানে আলোর অস্তিত্ব হয়তো থাকতো, কিন্তু থাকতো না কোনো মহাজাগতিক সংগীতের সেই মায়াবী লহরী কিংবা প্রাণের গূঢ় সংলাপ। প্রতিটি তারা তার স্বমহিমায় জ্বলে ঠিকই, কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্ন উজ্জ্বলতা কোনো জ্যোতির্বলয় সৃষ্টি করে না।
মানুষের সমাজতত্ত্বও এই মহাজাগতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে নয়। যাদের হৃদয়ে স্নিগ্ধ মমতা, চোখে আগামীর স্বপ্ন, কণ্ঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠ এবং আত্মায় ন্যায়ের শাশ্বত ধ্রুবতারা প্রদীপ্ত; তারা যখন আদর্শিক সূক্ষ্মতা বা মতভেদের প্রাচীরে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সমাজের আকাশটিও হয়ে যায় বিষণ্ণ, নিস্পৃহ এবং নিস্তব্ধ।
ভালো মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা কোনো সাধারণ ফাটল নয়; এ এক নিঃশব্দ মহাপ্রলয়, যা অন্তরমিনারের ভিত্তিকে উপড়ে ফেলে মানবতার শেকড়কে নড়বড়ে করে দেয়। এই বিভক্তিকে বলা যায় এক প্রকার ‘অস্তিত্ববাদী শীতলতা’, যেখানে আলো হয়তো চোখে পড়ে, কিন্তু তাতে কোনো উত্তাপ নেই; গতি দৃশ্যমান, কিন্তু নেই কোনো ধ্রুব গন্তব্য।
এই বাস্তবতার প্রতিধ্বনি আমরা ইতিহাসের কণ্ঠেও শুনতে পাই। “বিশ্বে শয়তানের জয়ের জন্য মন্দের আস্ফালন যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ভালো মানুষের রহস্যময় নীরবতা” মার্টিন লুথার কিং এর এই আক্ষেপিত উপলব্ধি ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতায় বারবার ধ্রুবসত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এই নীরবতার মূলে রয়েছে ভালো মানুষের পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় কথা সত্য, কিন্তু চিন্তার সূক্ষ্ম পার্থক্য, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা আর নীতির প্রশ্নে অনমনীয় দৃঢ়তা তাদের মাঝে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর তুলে দেয়। অথচ সেই প্রাচীরের ওপারে অন্যায়কারীরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজেদের স্বার্থের টানে একীভূত এবং সুসংগঠিত।
দুঃখজনক সত্য হলো, মন্দের শক্তি চিরকালই একরৈখিক এবং তাদের লোলুপ লালসা একবিন্দুতে মিলিত। বিপরীতে, ন্যায়ের ভাষা চিরকালই বহুমাত্রিক; কারো কাছে তা মানবিকতা, কারো কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ, কারো কাছে মুক্তি, আবার কারো কাছে তা কেবলই প্রতিরোধ।
ফলে ভালো মানুষেরা সত্যের শাশ্বত ভিত্তিতে একত্রিত হওয়ার বদলে সত্যের নিজস্ব ‘ব্যাখ্যা’ নিয়েই নিরন্তর সংঘাত ও তর্কে লিপ্ত হয়। তারা ভুলে যায়, সত্যকে কেবল অন্তরে লালন করলেই হয় না, তাকে বিজয়ী করতে শাণিত সততার পাশাপাশি সমন্বিত ঐক্যের রণকৌশলও অপরিহার্য।
এই সংকটের গভীরে নিহিত রয়েছে বাস্তবতাকে দেখার একপাক্ষিক সীমাবদ্ধতা। ফ্রানৎস কাফফা বলেছেন, “In the fight between you and the world, back the world.” অর্থাৎ, নিজের ক্ষুদ্র আদর্শিক আমিত্বের চেয়ে বাস্তবতার বিশালতাকে স্বীকার করে নাও।
ভালো মানুষেরা অনেক সময় স্বীয় আদর্শের শিখরে এতটাই সমাহিত থাকেন যে, পায়ের তলার মাটি, আর পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটকে প্রায়ই উপেক্ষা করে বসেন। আদর্শের গগনচুম্বী পাহাড়ে বসে থাকতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলেন সহমর্মিতার উদার সমুদ্র।
এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক, কিংবা সামাজিক নয়, এটি গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা। তারা সবসময় একে অপরের মাঝে নিজের অবিকল প্রতিবিম্ব খোঁজেন; আর যখনই সেই প্রতিবিম্বের সামান্য বিচ্যুতি ঘটে, তখনই জন্ম নেয় সংশয়।
এই সন্দেহ ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে গ্রাস করে, বিশ্বাসের ভূমি ক্ষয় করে এবং সংলাপের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলত, তারা একে অপরের পরিপূরক না হয়ে, হয়ে ওঠে কঠোর সমালোচক; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে একে অন্যের যাত্রাপথের প্রতিবন্ধকও।
এই সংকীর্ণতাই পরিণত হয় এক ধরনের আত্মমগ্নতায়।
তারা নিজেদের চিন্তার বিশুদ্ধতায় এতটাই ডুবে থাকেন যে, অন্যের চিন্তার ভিন্নতা দেখে আতঙ্কিত হয়। তারা ভাবে ‘আমার’ ন্যায়বোধ শুদ্ধ, ‘অন্যের’ নয় —এই আত্মবিশ্বাস চিন্তার দৃষ্টিকে সংকীর্ণ করে তোলে। অনেক সময় সত্যকে টুকরো খণ্ডিতও করে ফেলে।
এই খণ্ডিত বোধ থেকেই জন্ম নেয় পারস্পরিক প্রশ্ন, সন্দেহ, এমনকি অস্বীকৃতি। তখন দেখা যায়, দুর্নীতিবিরোধী একজন সমাজকর্মী নারী অধিকারকর্মীর অবস্থানকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেন না; নারী অধিকারকর্মী সমাজসংস্কারকের ভাষাকে কঠোর বা অগ্রহণযোগ্য মনে করেন; কবি যুক্তিবাদী চিন্তাকে শুষ্ক বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য এক, আর তা হলো, মানুষের কল্যাণ, সমাজের উন্নতি। তবুও তারা একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর বদলে, অদৃশ্য দূরত্বে অবস্থান নেন।
এ যেন এক মানসিক মধ্যাকর্ষণ, যেখানে সকল নক্ষত্র নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তিত হলেও কেউ কারো হাত ধরে নীহারিকা হয়ে ওঠে না।
এর পেছনে আরেকটি সূক্ষ্ম কারণ কাজ করে, আর তা হলো, প্রক্রিয়া বনাম ফলাফলের দ্বন্দ্ব। ভালো মানুষেরা জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেন ‘প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা’ নিয়ে। পক্ষান্তরে মন্দ শক্তিরা সবসময়ই ‘ফলাফল’ বা প্রভাবের দিকে মনোযোগী। তাই তারা লক্ষ্য অর্জনের পথে ব্যক্তিগত মতপার্থক্যকে গুরুত্ব দেয় না; বরং তা আড়াল করে রাখে বৃহত্তর স্বার্থে।
বিপরীতে, ভালো মানুষেরা প্রায়ই উল্টো পথে হাঁটেন। সামান্য মতভেদকেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। তাদের মাঝে ‘পারস্পরিক বিশ্বাসের’ এক তীব্র খরা বিরাজ করে। “সে কি আমার মতো সৎ?” এই অহেতুক সংশয় তাদের ঐক্যের মেরুদণ্ডকে নড়বড়ে করে দেয়। ফলে তাদের মাঝে একটা মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
এই দূরত্বকে আরও গভীর করে মানুষের অস্তিত্বগত ভয়।
জ্যঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন- ‘Hell is other people’. ভালো মানুষেরাও কখনও কখনও অন্য ভালো মানুষের চোখে ‘অন্য’ হয়ে ওঠে । তাদের চিন্তার পার্থক্য তাদেরকে ‘অপর’ করে তোলে। তারা ভয় পায়, অন্য ভালো মানুষের চিন্তা যদি নিজের সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অারেকটা সংকট হলো, ভালো মানুষেরা মিডিয়ার আলোয় আসেন না। তারা প্রচারের কাঙাল নন। ফলে সমাজের প্রচারযন্ত্রে তারা আড়ালে থেকে যান। আর এই নিঃশব্দতা সমাজকে অচল করে দেয়। ফলে মিডিয়ার আলোয় যারা মন্দ, তারা হাজির হয় ‘বিপ্লবী’, কিংবা ‘সাহসী’র মুখোশে। আর সত্যিকারের ভালোরা থেকে যায় পর্দার অন্তরালে। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে ভালো মানুষের পরিচিতি হয় অস্পষ্ট, অনুজ্জ্বল।
ইতিহাসে এই নিঃশব্দটার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। Adolf Hitler-এর উত্থান শুধু নাৎসিবাদের জন্য হয়নি, ভালো মানুষের নিস্তবদ্ধতার জন্যও হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের গণহত্যা শুধু উগ্রবাদীদের কাজ নয়, বিশ্বমানবতার ব্যর্থতা।ফিলিস্তিনের কান্না শুধু ই*রায়েলের বুলেট নয়, পুরো দুনিয়ার ভালো মানুষদের বিভক্তির ফসল। যখনই ভালোরা নীতিতে দৃঢ় থেকেও রাজনীতি, কিংবা কৌশলে দুর্বল হয়েছে, তখনই সমাজ অশুভদের পদতলে পিষ্ট হয়েছে।
তাই সভ্যতা সবসময়ই ভালোদের ঐক্য চায়। কিন্তু আমাদের সমাজ এমনভাবে গঠিত, যেখানে ভালো মানুষদের অবস্থান প্রান্তে। তারা নীতিতে দৃঢ়, কিন্তু রাজনীতিতে দুর্বল; তারা ন্যায়ে স্পষ্ট, কিন্তু ঐক্যের অভাব। ফলে তারা হয় নিঃসঙ্গ, নাহয় বিভ্রান্ত।
প্রাচীন গ্রিক উপকথায় বলা আছে, জিউস একদিন সব ভালো মানুষকে ডেকে বলেছিলেন, “তোমাদের আলাদা আলাদা সত্য যদি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তাহলে মিথ্যার দরজাই খুলে যাবে।” আজকের যামানায় ঠিক এই সত্যের সংঘর্ষই মিথ্যার বিজয়কে ত্বরান্বিত করছে। ন্যায় যখন ন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তখন অন্যায় বিজয়োল্লাসে মত্ত হয়, আরো শক্তিশালী হয়।
ভালো মানুষেরা বিভক্ত; কথা সত্য, তবে অনিবার্য নয়। এটি কেবল একটি মানসিক জড়তা, যা বদলানো যায়। প্রয়োজন কেবল হৃদয়কে বৃহৎ করা, এবং আদর্শিক অনমনীয়তার চেয়ে বৃহত্তর কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া।
যেদিন শুভশক্তিরা তাদের ক্ষুদ্র মতভেদ বিসর্জন দিয়ে সম্মিলিত স্বরে আওয়াজ তুলবে, সেদিন ইতিহাস আবার আলোর মুখ দেখবে। অন্ধকার তখনই শাশ্বত নিয়মে আত্মসমর্পণ করবে, যখন প্রতিটি বিচ্ছিন্ন নক্ষত্র সমবেত হয়ে এক প্রদীপ্ত জ্যোতির্বলয় রচনা করবে।

সৈয়দ হৃদয়
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬ । ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ