বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাংক আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রায় সব ধরনের আর্থিক কর্মকাণ্ডেই কোনো না কোনোভাবে ব্যাংকের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বেতন গ্রহণ, অর্থ স্থানান্তর, অনলাইন কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থ আদান-প্রদানসহ সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এক কথায়, দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের অধিকাংশই ব্যাংকনির্ভর। ফলে এই সময়ে এসে ব্যাংককে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু বিপত্তি হলো প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেম নিয়ে। এই সিস্টেমের মূলেই আছে সুদের মত ভয়াবহ একটি গোনাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা। এসব ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে সঞ্চয়ী হিসাব, ডিপোজিট, এফডিআর কিংবা ঋণ গ্রহণ—সর্বত্রই সুদের উপাদান বিদ্যমান। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকিং এর সাহায্যেও সুদবিহীন সেবা গ্রহণ সম্ভব। যেমন সুদবিহীন কারেন্ট একাউন্ট ওপেনিং, ইউটিলিটি বিল প্রধানসহ মৌলিক কয়েকটি সার্ভিস। ব্যাংকের সামগ্রিক সার্ভিস এর তুলনায় যা খুবই সামান্য।
বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে ব্যাংক যেমন অপরিহার্য; ঠিক তেমনিভাবে সুদ পরিহার করা হারাম থেকে বেঁচে থাকা একজন মুসলিমের জন্য আরো বেশি অপরিহার্য। কেননা পবিত্র কোরআনুল কারিমে সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু নিষিদ্ধ নয়; বরং সুদি লেনদেনে জড়িয়ে যাওয়াকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করার মত বলা হয়েছে।
ঠিক এই বাস্তবতা নিরিখেই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। যে কারণে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই পুরো বিশ্বজুড়েই প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে ইসলামি ব্যাংকিং-এর আলোচনা সরব হয়ে ওঠে। উপমহাদেশসহ বিশ্বনন্দিত ইসলামিক স্কলারগণ ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।
ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ব্যবহারিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৩ সালে মিশরের মিত গামরে আহমদ আল-নাজ্জারের প্রতিষ্ঠিত Mit Ghamr Savings Bank-এর মাধ্যমে; আর ১৯৭৫ সালে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (IsDB) ও Dubai Islamic Bank প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। একই সূত্র ধরে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং এর যাত্রা ১৯৮৩ সনে ‘ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র মাধ্যমে শুরু হয়। বর্তমানে বাংলাদেশেপূর্ণাঙ্গ ১০টি ইসলামি ব্যাংক রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে আরও অনেক প্রচলিত ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো ও ইসলামি শাখার মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি প্রচলিত ব্যাংক ৬০০-এর বেশি ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো পরিচালনা করছে এবং ১৫টি ব্যাংকের ৩০টি ইসলামি শাখা রয়েছে।
ইসলামি ব্যাংকিং মূলত কী?
ইসলামি ব্যাংকিং মূলত সুদের পরিবর্তে মুদারাবাভিত্তিক আমানত গ্রহণের নীতির ওপর পরিচালিত হয়। সহজভাবে বলতে গেলে, একজন গ্রাহক যখন ইসলামি ব্যাংকে হিসাব খোলেন, তখন তিনি মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যাংকের কাছে অর্থ বিনিয়োগ করেন। ব্যাংক সেই অর্থ মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা, ইজারা প্রভৃতি শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ খাতে ব্যবহার করে। এসব কার্যক্রম থেকে অর্জিত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত অনুপাত অনুযায়ী ব্যাংক ও আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
সার্বিকভাবে ইসলামি ব্যাংকিং সুদভিত্তিক ঋণব্যবস্থার পরিবর্তে শরিয়াহসম্মত বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং লাভ-ক্ষতিতে অংশীদারিত্বের নীতির ওপর আর্থিক সেবা প্রদানের চেষ্টা করে। এর ফলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যই সুদমুক্ত আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
প্রচলিত ইসলামি ব্যাংক পুরোপুরি শরিয়সম্মত?
বলা বাহুল্য যে, প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও শরিয়াহ পরিপালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদ্যমান। অধিকাংশ ইসলামি ব্যাংকে শরিয়াহ বোর্ডের কার্যকারিতা যথাযথভাবে নিশ্চিত নয়। ব্যাংকিং লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন: মুরাবাহা, এইচপিএসএম, ক্রেডিট কার্ড কিংবা এলসি সংক্রান্ত লেনদেনে—বহু ধরনের অসঙ্গতি ও ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। এসব সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানও অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামি ব্যাংকিং কেন প্রয়োজন?
বর্তমান বাস্তবতায় সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অত্যন্ত কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে হালাল উপায়ে ব্যাংকিং লেনদেন পরিচালনার জন্য ইসলামি ব্যাংকিংয়েরচেয়ে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প বর্তমানে নেই। এ কারণেই ইসলামি ব্যাংকিং কেবল একটি বিকল্প ব্যবস্থা নয়; বরং মুসলিম সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। তবে এটাও সত্য যে, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। তাই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শরিয়াহ গভর্ন্যান্সের শক্তিশালীকরণ এবং শরিয়াহ মানদণ্ডের আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল বাস্তবায়ন সময়ের অন্যতম দাবি। এই কাজ কোনো একক ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
বিশেষত ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য পৃথক ও কার্যকর আইন প্রণয়ন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রাহকদের আস্থা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা উচিত। ইসলামি ব্যাংকিং যত বেশি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও শরিয়াহসম্মত হবে, ততই এটি দেশের অর্থনীতি ও জনগণের কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

মুফতি উবাইদুর রহমান হাম্মাদ
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬ । ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ