ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ডক্টরস রুম, পঞ্চম তলা। সামনে বসে থাকা এক তরুণী ইন্টার্ন চিকিৎসককে ঘিরে পরিচিত-অপরিচিত সবার উপস্থিতিতেই তাচ্ছিল্যভরা ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ জবাবদিহি করাচ্ছিলেন এক চিকিৎসক। পরে জানতে পারলাম, তার নাম জালাল। নিজের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি শুধু এতটুকুই বলেছিলেন—”আমার নাম জালাল।”
সেদিন আমরা চারজন সাংবাদিক একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য নিতে সেখানে গিয়েছিলাম। অনুমতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করার পরও প্রায় দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। দু’বার সালাম দিলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। আমাদের উপস্থিতিকে যেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই উপেক্ষা করছিলেন।
তিনি তখন ওই ইন্টার্ন চিকিৎসককে একই বিষয় নিয়ে বারবার প্রশ্ন করছিলেন। মনে হচ্ছিল, অসুস্থতার কারণে কোনো দিন অনুপস্থিত থাকার ব্যাখ্যা চাইছেন। মেয়েটি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছিলেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং ব্যক্তিগত অসুস্থতার কথা অন্যের কাছে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কিন্তু তার ব্যাখ্যা যেন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছিল না। বরং একই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তাকে সবার সামনে বিব্রত করা হচ্ছিল।
অবশেষে ইন্টার্ন চিকিৎসক উঠে চলে গেলেন। এরপরও কয়েক মুহূর্ত তিনি নির্বিকার হয়ে বসে রইলেন। তখন আবার সালাম দিয়ে নিজেদের পরিচয় ও আসার উদ্দেশ্য জানাই। তবুও তিনি কোনো সৌজন্য দেখালেন না, বসতেও বললেন না।
রোগীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, হাসপাতালের পরিচালকের অনুমতি ছাড়া কিছুই বলা যাবে না। এ সময় সহকর্মী সজল পরিচালককে ফোনে সংযুক্ত করে তার হাতে মোবাইলটি দেন। কিন্তু তিনি পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেন, “স্যার, এই সাংবাদিকেরা রুমে ঢুকে ক্যামেরায় সাক্ষাৎকার নিচ্ছে।”
অথচ তখন পর্যন্ত আমরা কোনো সাক্ষাৎকারই শুরু করিনি।
আমি তাকে বললাম, “আমরা তো আপনার সাক্ষাৎকার নিচ্ছি না। তাহলে এমন কথা বললেন কেন?”
সজলও বিনয়ের সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, আমাদের শুধু রোগীর অবস্থা জানতে হবে—কেন ভর্তি হয়েছেন, বর্তমান শারীরিক অবস্থা কী, চিকিৎসা কী চলছে।
জবাবে তিনি বলেন, “আমরা এসব সাক্ষাৎকার দিই না। পুলিশ কেস। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করলে সার্টিফিকেট লিখে দেব।”
আমি তখন অনুরোধ করলাম, ক্যামেরার সামনে নয়, অন্তত অনানুষ্ঠানিকভাবে রোগীর অবস্থা জানাতে। কিন্তু তিনি কোনো ধরনের সহযোগিতা করলেন না।
এরপর আমরা নিচে নেমে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এনামুল হককে বিষয়টি জানাই এবং সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার অনুরোধ করি।
এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। নব্বইয়ের দশক থেকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু সাংবাদিক একই ধরনের অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। তখন মোবাইল ফোনও ছিল না। জরুরি বিভাগের ল্যান্ডফোনে অনেক কষ্টে যোগাযোগ করা গেলেও সাংবাদিক পরিচয় জানার পর অনেকেই তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করতেন, কখনো ফোন কেটে দিতেন, কখনো দুর্ব্যবহার করতেন।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি দেখলেই অস্বস্তি বোধ করেন। অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় রূঢ় আচরণ করেন। বিষয়টি বহুবার কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন খুব একটা চোখে পড়ে না।
সেদিনও প্রবল বৃষ্টি ছিল। দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়নি। টানা বৃষ্টিতে বাসায় ফিরতে না পেরে দুই দিন গোসলও করা হয়নি। তারপরও সংবাদটির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রেসক্লাব থেকে ইজিবাইকে করে আমি, সময় টিভির সজল ভাই, আনন্দ টিভির মনির ভাই এবং সঞ্জয় হেচলার ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যাই চরভদ্রাসনের ফাস্টফুড ব্যবসায়ী রব মোল্লার খবর সংগ্রহ করতে।
শেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—একজন মানুষের পরিচয় শুধু নাম দিয়ে শেষ হয় না। কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিচয় হলো তার ব্যবহার। চিকিৎসকের পেশা শুধু চিকিৎসা দেওয়ার নয়; রোগী, স্বজন এবং পেশাগত দায়িত্বে আসা মানুষের প্রতিও ন্যূনতম সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শন করা সেই পেশারই অংশ।
সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আচরণগত সৌজন্য ও জনসেবামূলক মানসিকতার ওপরও আরও গুরুত্ব দেওয়া হোক। কারণ, একটি হাসপাতালের সেবার মান শুধু চিকিৎসা নয়, মানুষের সঙ্গে তার আচরণেও প্রতিফলিত হয়।
পুনশ্চ: এই লেখাটি ২০২৩ সালের ১০ আগস্টের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরদিন ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়েছিল। ফরিদপুরের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা আজও অনেকাংশে প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় পাঠকদের জন্য এটি পুনরায় প্রকাশ করা হলো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর

হারুন আনসারী
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬ । ২:২৪ অপরাহ্ণ