প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা। আষাঢ়ের এক বৃষ্টিভেজা দিনে অকারণেই গিয়েছিলাম ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার একটি বাড়িতে। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি, আর ভেতরে ধোঁয়া ওঠা রং চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্পে মেতে উঠেছিলাম।
হঠাৎ চোখ পড়ল ঘরের আলমারির দিকে। দেখি, একটি ছোট্ট ইঁদুরের বাচ্চা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি গন্ধের ব্যাপারে একটু সংবেদনশীল। শুরু থেকেই ইঁদুরের বিষ্ঠার গন্ধে অস্বস্তি লাগছিল। তাই বাড়ির কর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ইঁদুরের এত উৎপাত কেন?”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এর পেছনে আছে সিমতির গল্প।”
সিমতি—হালকা-পাতলা, ছিপছিপে গড়নের সাদা-কালো ডোরাকাটা একটি মেয়ে বিড়াল। খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। মাঝে মাঝে রান্নাঘর থেকে মাছ চুরি করত, কখনো বিছানায় প্রসাবও করে ফেলত। তবে একটি ব্যাপারে সে ছিল ব্যতিক্রম—অজায়গায় কখনো বিষ্ঠা ত্যাগ করত না। আর ইঁদুর দেখলে তো কথাই নেই; মুহূর্তেই শিকার ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ত।
একদিন পাশের বাড়ির একটি বিড়ালছানার সঙ্গে খেলতে গিয়ে খামচি কেটে দেয় সিমতি। এতে বিরক্ত হয়ে বাড়ির কর্তা তার ধারালো নখ কেটে দেন। শুধু তাই নয়, পাথর দিয়ে ঘষে তার সূচালো দাঁতও ভোঁতা করে দেন।
সেদিনের পর থেকেই যেন সিমতি আর আগের সিমতি রইল না।
নখ-দাঁতহীন সিমতি আর পাশের বাড়ির বিড়ালছানার সঙ্গে খেলতে যায় না। বাড়ির সামনে আকাশছোঁয়া শিমুল গাছে আর উঠে না। ইঁদুরের উপস্থিতি টের পেলেও আর শিকারের প্রস্তুতি নেয় না। সারাদিন রান্নাঘরের চুলার পাশে শুয়ে-বসে শুধু ম্যাও ম্যাও করে।
বাড়ির কর্তা একদিন জোর করে তাকে একটি ইঁদুরের সামনে এনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু ইঁদুর শিকার করা তো দূরের কথা, ইঁদুরের ভয়ে সিমতিই দৌড়ে পালিয়ে গেল!
একসময় যে বাড়িতে ইঁদুরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেখানে এখন যেন ইঁদুরের রাজত্ব। খাবার টেবিলে ইঁদুর, সোফার নিচে ইঁদুর, আলমারির ভেতর ইঁদুর—চারদিকে শুধু ইঁদুর আর ইঁদুর।
বাড়ির কর্তা আক্ষেপ করে বললেন, “এখন বুঝি, কী ভুলটাই না করেছি! কেন যে সিমতির নখ কেটে দিলাম, দাঁত ঘষে ভোঁতা করে দিলাম!”
আমি বললাম, “তাহলে নতুন একটা বিড়াল আনুন।”
তিনি মৃদু হেসে বললেন,“নতুন বিড়াল এনে কী হবে? ইঁদুরগুলোর তো এখন অভ্যাস হয়ে গেছে বিড়ালকে তাড়া করার, বিড়ালকে নিয়ে খেলা করার, এমনকি বিড়ালের মুখের ওপরই হাগু করার!”
কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলাম।
ঠিক তখনই বাইরে মোটরসাইকেলের হর্ন শোনা গেল। একই সঙ্গে ভেসে এল কারও কণ্ঠস্বর—“হ… হ… পুলিশকে আরও দুর্বল কর। তারপর শান্তিতে বসবাস কইরা দেইখো!”
জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, হালকা করে চুল ছাঁটা, পেটমোটা এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল চালিয়ে দূরে মিলিয়ে গেল।
এরই মধ্যে বৃষ্টিও থেমে গেছে। বাড়ির কর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা হলাম।
কিন্তু আজও মাঝে মাঝে সিমতির কথা মনে পড়ে। মনে হয়, যার নখ-দাঁত কেটে তাকে অসহায় করে দেওয়া হয়, সে শুধু নিজের শক্তিই হারায় না—তার সঙ্গে হারিয়ে যায় চারপাশের স্বাভাবিক ভারসাম্যও।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা

সোহানুর রহমান
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬ । ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ