বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের যে ৫ কারণ?

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬ । ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। অপরদিকে ৬০ বছর পর পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপে কোনো দল হিসেবে আর্জেন্টিনার সামনে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল।

কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে হেরে বিশ্বকাপের শিরোপা হাতছাড়া করেছে আর্জেন্টিনা। স্কোরলাইন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে হলেও পুরো ১২০ মিনিটে মাঠের খেলায় স্পেনের আধিপত্য ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। ফাইনালে আর্জেন্টিনার হারের পেছনে যেসব কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তার অন্যতম পাঁচ কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল লিওনেল মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। মেসিকে এদিন পুরোপুরি আটকে রাখতে সক্ষম হয় স্পেন। দলটির কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আর্জেন্টিনাকে আটকানোর জন্য মেসিকে কেন্দ্র করে বিশেষ রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজ পুরো ম্যাচে মেসিকে কড়া পাহারায় (ম্যান-মার্কিং) রাখেন। ফলস্বরূপ, মেসি মাঠে স্বাধীনভাবে খেলার জায়গা পাননি এবং বল বানানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটে মেসি মাত্র একবার বল স্পর্শ করেন, যা স্পেনের কড়া মার্কিংয়েরই প্রতিফলন। ফাইনালের আগে টুর্নামেন্টে ৮ গোল করা আর্জেন্টাইন অধিনায়কের গোলের প্রত্যাশিত মান ছিল মাত্র ০.০৪। পুরো ম্যাচে তিনি একটি কী পাসও দিতে পারেননি।

২. স্পেনের মিডফিল্ডের আধিপত্য

পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই স্পেনের মিডফিল্ড ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় বলের দখল রাখতে দেয়নি তারা। দ্রুত পাসে আক্রমণ গড়ে তোলার পাশাপাশি বল দখলেও ছিল দারুণ কার্যকর। ফাইনালেও সেই আধিপত্য ধরে রেখে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে দেয়নি স্পেন।

ওয়ান-টাচ ফুটবল এবং গতিশীল পাসিংয়ের সামনে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা স্পেনের কাছে ছিল সম্পূর্ণ পরাস্ত। রদ্রি ও পেদ্রিদের মতো স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখায় আর্জেন্টিনা কাউন্টার অ্যাটাকের তেমন কোনো সুযোগ পায়নি।

৩. এঞ্জো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড

দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে পাও কুবারসির ওপর ফাউল করায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আলবিসেলেস্তেদের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা এঞ্জো ফার্নান্দেজ। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় ফাউল করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি।

টুর্নামেন্টজুড়ে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে একজন কম নিয়ে খেলা আর্জেন্টিনার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ায় ম্যাচের শেষ দিকে সমতায় ফেরার জন্য আর্জেন্টিনার আক্রমণের শেষ সুযোগটুকুও শেষ হয়ে যায়। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ছয় মিনিটে সংখ্যাগত এই সুবিধাই কাজে লাগায় স্পেন। সঠিক জায়গায় থাকা ফেরান তোরেস সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জয়সূচক গোল করেন।

৪. লিসান্দ্রো ও রোমেরোর চোটে ডিফেন্সে ভারসাম্য নষ্ট

টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর জুটি ছিল অন্যতম শক্তি। কিন্তু ম্যাচের প্রথমার্ধেই আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা লিসান্দ্রো মার্তিনেজ হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে পড়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর আরেক নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর চোট কোচ লিওনেল স্কালোনির পুরো রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা এলোমেলো করে দেয়। এই দুই মূল ডিফেন্ডারের অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার রক্ষণকে দুর্বল করে তোলে। মার্তিনেজ ও রোমেরোর অনুপস্থিতিতে শুধু রক্ষণ নয়, পেছন থেকে বল এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ে।

৫. আক্রমণে ছিল না কোনো গতি

ফাইনালের আগে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৯ গোল করেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে তাদের আক্রমণ প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিল। কোচ লিওনেল স্কালোনি ফাইনালে অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ বা রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেন। গোল হজম না করার অতি-সাবধানী মানসিকতার কারণে দল খুব বেশি নিচে নেমে ডিফেন্ড করছিল, যা স্পেনের আক্রমণভাগকে আরও চেপে বসার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে অতিরিক্ত সময়ের আগে দলের সব সাবস্টিটিউশন শেষ হয়ে যায় এবং শেষে নতুন কোনো আক্রমণাত্মক বদলি নামানোর সুযোগ ছিল না।

এমন রক্ষণাত্মক খেলার ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা একটি শটও নিতে পারেনি। পুরো ১২০ মিনিটে তারা মোট মাত্র দুটি শট নেয়, যার একটিও লক্ষ্যে ছিল না। অন্যদিকে স্পেন নেয় ২০টি শট, যার ১২টি ছিল লক্ষ্যে। পরিসংখ্যানেও দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট। স্পেনের প্রত্যাশিত গোলের মান ছিল প্রায় ১.৯৪, যেখানে আর্জেন্টিনার ছিল মাত্র ০.১৭। এই পরিসংখ্যানই ম্যাচে স্পেনের আধিপত্যের চিত্র তুলে ধরে।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন