ফরিদপুরের নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারির অবাধ ব্যবহারে দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে—এমন চিত্র তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশের পরপরই নড়েচড়ে বসেছে মৎস্য বিভাগ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একের পর এক ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জব্দ করে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জেলার সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, চরভদ্রাসন, সদরপুর ও আলফাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন উপজেলায় নদী-খালজুড়ে চায়না দুয়ারির বিস্তার, দেশীয় মাছের প্রজননে এর মারাত্মক প্রভাব এবং স্থানীয়দের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনে মৎস্য বিভাগের দৃশ্যমান অভিযান নিয়ে প্রশ্নও তোলা হয়েছিল।
এর পরপরই আলফাডাঙ্গা, সালথা, মধুখালী ও ভাঙ্গা উপজেলায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সোমবার (২৭ জুলাই) আলফাডাঙ্গা উপজেলার বানা এলাকা সংলগ্ন মধুমতি নদীতে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মৎস্য বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত নূর মৌসুমী। অভিযানে প্রায় ৩৭০ মিটার নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭০ হাজার টাকা। পরে জব্দকৃত জাল জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
একই দিনে ভাঙ্গা উপজেলার জানদী চক বিলে অভিযান চালিয়ে ২২টি নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল জব্দ ও ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা হয়। জব্দকৃত জালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ মিটার এবং এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের কুষ্টিয়ার চক ও মালঞ্চ নদীতে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মৎস্য দপ্তরের যৌথ অভিযানে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যের মোট ৩৫টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জব্দ করা হয়। প্রায় ৮৫ হাজার টাকা মূল্যের এসব জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দবির উদ্দিন।
তিনি বলেন, “চায়না দুয়ারি আমাদের মৎস্যসম্পদের নীরব ঘাতক। ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, রেণুপোনা, এমনকি জলজ জীববৈচিত্র্যও এ ফাঁদের কারণে ধ্বংস হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশীয় মাছ সংরক্ষণে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।”
একই দিনে মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের গাড়িদহ নদীর চার খালের মাথায় উপজেলা মৎস্য বিভাগের বিশেষ অভিযানে প্রায় দুই মণ ওজনের কয়েকটি অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল ও মাছ আটকে রাখার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
মধুখালী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাস বলেন, “বর্ষাকাল দেশীয় মাছের প্রজননের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ব্যবহারের ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হয়। তাই জনসচেতনতার পাশাপাশি নিয়মিত অভিযানও অব্যাহত থাকবে।”
এছাড়া সদর, নগরকান্দা, চরভদ্রাসন, সদরপুরেও অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য বিভাগ।
ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করে নিষিদ্ধ ফাঁদ অপসারণ করা হচ্ছে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
ফরিদপুরের নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, সাম্প্রতিক এসব অভিযান ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু অভিযান নয়, চায়না দুয়ারি উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস বন্ধ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই ফরিদপুরের নদী-খাল ও বিলে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ । ৪:০১ অপরাহ্ণ