বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে দোতারার সুরের কথা উঠলেই যে কজন শিল্পীর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অন্যতম উপমহাদেশের প্রখ্যাত দোতারা বাদক, লোকশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কানাইলাল শীল। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের মতো কিংবদন্তিদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি বাংলা লোকসংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর জন্মভিটা আজও অবহেলিত। স্মৃতিচিহ্নগুলো অরক্ষিত, নেই কোনো স্মৃতি জাদুঘর, সংগীতচর্চার কেন্দ্র কিংবা পর্যটন-উপযোগী কোনো উদ্যোগ।
সরেজমিনে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লস্করপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে নিস্তব্ধতা। বাড়ির পাশে একটি জরাজীর্ণ সিমেন্টের স্মৃতিফলক, যার গায়ে ধুলাবালি ও ময়লা জমে রয়েছে। সেখানে কানাই লাল শীলের জন্ম-মৃত্যুসহ সংক্ষিপ্ত পরিচয় লেখা আছে। যে তমাল গাছের নিচে বসে তিনি একসময় দোতারার সুরে মানুষকে মোহিত করতেন, সেই স্মৃতিচিহ্নও আর নেই। ঘরের ভেতরে তাঁর একটি ছবি এবং তাঁকে নিয়ে লেখা কয়েকটি বই পাওয়া গেলেও সেগুলোও অযত্নে পড়ে রয়েছে। যেকোনো সময় মূল্যবান এসব স্মারক নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জন্ম, শৈশব ও সংগীতে হাতেখড়ি:
কানাইলাল শীলের জন্ম ১৮৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর, ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করপুর গ্রামে। তাঁর পিতা আনন্দচন্দ্র শীল এবং মাতা সৌদামিনী শীল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারান তিনি। এরপর মা ও কাকিমার স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হয়ে ওঠেন।
সংগীতের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। মাত্র আট বছর বয়সে ওস্তাদ বসন্ত কুমার শীলের কাছে বেহালায় হাতেখড়ি হয়। পরে এগারো বছর বয়সে ওস্তাদ মতিলালের কাছে বেহালার পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
দোতারার টানে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা:
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় দরবেশ দাণ্ড শাহের মাজারে দোতারা বাদনের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কিংবদন্তি দোতারা বাদক তরবন সরকারের সুরে মুগ্ধ হন কানাই লাল শীল। পরে তাঁরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
গ্রামবাংলার কবিগান, যাত্রাপালা, গাজীর গান, কীর্তনসহ বিভিন্ন ধারার লোকসংগীতে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন এবং অল্প সময়েই সুনাম অর্জন করেন।
জসীমউদ্দীন, নজরুল ও আব্বাসউদ্দীনের সান্নিধ্যে:
ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে একটি যাত্রানুষ্ঠানে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। জসীমউদ্দীন তাঁর অসাধারণ প্রতিভা উপলব্ধি করে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানে লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।
আব্বাসউদ্দীনের অনুপ্রেরণায় কানাইলাল শীল লোকগান লেখা শুরু করেন এবং গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হন। এই সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নজরুলের গানের সঙ্গে নিয়মিত দোতারা বাজাতেন তিনি।
পরবর্তীতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রে নিয়মিত দোতারাবাদক হিসেবে যোগ দেন। দেশভাগের পর ১৯৪৯ সালে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা:
ঢাকা বেতারে যোগ দেওয়ার পর পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গানে তাঁর দোতারার সুর শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। তিনি শুধু দোতারা বাদকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সফল গীতিকার ও সুরকারও।
‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’, ‘আমায় ঘরছাড়া করিলি রে, সুখ বসন্ত সুখের কালে’ সহ অসংখ্য গান তিনি নিজেই রচনা ও সুর করেছেন।
তাঁর লেখা ও সুর করা গান গেয়েছেন শচীন দেব বর্মন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আব্দুল আলীম, ফেরদৌসী রহমানসহ বাংলা সংগীতের বহু কিংবদন্তি শিল্পী।
একুশে পদকে সম্মানিত:
১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কানাই লাল শীল। পরে বাংলা লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮৭ সালে (মরণোত্তর) একুশে পদকে ভূষিত করে।
কানাইলাল শীলের পরিবার:
কানাইলাল শীলের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে।
বড় ছেলে কুমোত কান্ত শীল বাংলাদেশ বেতারের যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালে মারা যান।
মেজ ছেলে আশুতোষ শীল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দোতারা বাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ৩ এপ্রিল ২০২৪ সালে মারা যান।
ছোট ছেলে অবিনাশ শীল বাংলাদেশ বেতারের ঢাকা কেন্দ্রের যন্ত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি ৬ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে বকুল রানী মারা গেছেন। মেজ মেয়ে ফুলমালা শীল বর্তমানে জীবিত আছেন। তাঁর বিয়ে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বহুগ্রামে। ছোট মেয়ে গৌরী রানী শীলের বিয়ে যশোর সদর উপজেলার বারিন্দ্রীপাড়ায় হয়েছিল। তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে মারা যান।
বর্তমানে লস্করপুরের বাড়িতে বসবাস করছেন বড় ছেলে কুমোত কান্ত শীলের ছেলে বাদল চন্দ্র শীল।
নাতির ঘরে আজও টিকে আছে স্মৃতি:
বাদল চন্দ্র শীল ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন। চাকরিজীবনে পুলিশ সাংস্কৃতিক পরিষদের যন্ত্রশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন। ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে ৯০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত পৈতৃক বাড়িতে স্ত্রী মাধুরী শীল, দুই মেয়ে তমা ও তনু শীল এবং ছেলে অপূর্ব শীলকে নিয়ে বসবাস করছেন।
বাদল চন্দ্র শীল বলেন, “চার-পাঁচ বছর আগে তৎকালীন ইউএনওকে দাদার বাড়ির বিষয়ে জানিয়েছিলাম। তিনি আসবেন বলেছিলেন, আসেননি। পরে আরেক ইউএনওও আসতে চেয়েছিলেন, তিনিও আসেননি। এভাবেই শুধু আশ্বাস পেয়েছি। মাঝেমধ্যে ভক্তরা আসেন, কিন্তু এখানে এসে দেখানোর মতো কিছুই পান না।”
তিনি বলেন, “এখানে একটি সংগীতচর্চা কেন্দ্র প্রয়োজন। হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশিসহ কিছু বাদ্যযন্ত্র থাকলে এলাকার শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা চর্চা করতে পারবে। স্মৃতিস্তম্ভটি সংরক্ষণ করা দরকার। পাশাপাশি একটি লাইব্রেরি ও স্মৃতি সংরক্ষণাগার হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।”
তিনি আরও জানান, প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর কানাই লাল শীলের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বাড়িতে কাঙালি ভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। কিন্তু গত দুই বছর আর্থিক সংকটের কারণে সেটিও বন্ধ রয়েছে।
স্ত্রীর আক্ষেপ:
বাদল চন্দ্র শীলের স্ত্রী মাধুরী শীল বলেন, “কেউ কখনো আমাদের খোঁজ নেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেই। প্রশাসনও শুধু আশ্বাস দিয়েছে। আপনারা লিখে কী করতে পারবেন—এটাই এখন আমাদের প্রশ্ন।”
১৯৯৪ সালে নিজ গ্রামে পুনঃসমাধি:
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর পর ঢাকার পোস্তখোলায় কানাই লাল শীলকে দাফন করা হয়েছিল। পরে ১৯৯৪ সালে ঢাকার শিল্পীরা তাঁর দেহাবশেষ এনে লস্করপুরের নিজ বাড়িতে পুনঃসমাধিস্থ করেন। বর্তমানে সেখানে একটি সিমেন্টের স্মৃতিফলক রয়েছে।
ছাত্রের প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠী:
জানা গেছে, সাবেক পুলিশ সুপার এম. খালেক ছিলেন কানাই লাল শীলের ছাত্র। তিনি ‘কানাইলাল শীল শিল্পগোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি নিজেও গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। ২০২৫ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে এই শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত পল্লীগীতি পরিবেশন করে।
গবেষকদের মত:
ফরিদপুরের লেখক ও গবেষক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, “কানাইলাল শীলের সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমি ভারতেও দেখেছি, তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী উদ্যোগ নেই। এটি দুঃখজনক। সরকার চাইলে তাঁর গ্রামের বাড়িকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।”
সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি:
নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি এহসানুল হক মিয়া বলেন,”কানাইলাল শীল শুধু ফরিদপুরের নয়, সমগ্র বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। দ্রুত উদ্যোগ না নিলে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাবে।”
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, “যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না। তাই গুণীজনদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। সরকার ও প্রশাসন দ্রুত তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি।”
ফরিদপুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, “কানাইলাল শীলের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে নতুন প্রজন্ম বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন,”শুধু স্মরণসভা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। গুণী মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কানাই লাল শীলের বাড়িটি সংরক্ষণ করা হলে এটি দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠতে পারে।”
নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ শাহিনুজ্জামান শাহিন বলেন, “কানাইলাল শীল শুধু নগরকান্দার নয়, পুরো বাংলাদেশের গর্ব। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে রাজনীতি নয়, সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।”
প্রশাসনের আশ্বাস:
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “কানাইলাল শীলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি পরিদর্শন করে সংরক্ষণের সম্ভাব্য উদ্যোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “কানাইলাল শীল শুধু বাংলাদেশের নয়, উপমহাদেশের একজন খ্যাতিমান শিল্পী। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতে খুব শিগগিরই আমরা তাঁর বাড়ি পরিদর্শনে যাব। সেখানে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”
উপমহাদেশের লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করা এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবন, সৃষ্টি ও অবদান আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু তাঁর জন্মভিটা যদি অযত্নে হারিয়ে যায়, তবে হারিয়ে যাবে বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসের এক মূল্যবান অধ্যায়ও। তাই সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের প্রত্যাশা—সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সচেতন মানুষ সম্মিলিত উদ্যোগে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গুণী শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত করবেন।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ । ৪:১২ অপরাহ্ণ