একটি পোটলা, একটি লাঠি আর এক বৃদ্ধার অপেক্ষাহীন জীবন

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ । ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ

ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে ৯টা ছুঁইছুঁই। বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি। ফরিদপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মিটমিট করে জ্বলছে ডিম লাইটের ক্ষীণ আলো। দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল মিলিয়ে যায় রাতের নিস্তব্ধতায়। একটি কুকুর ধীরে ধীরে পাশ ঘেঁষে চলে যায়। চারপাশে মানুষের আনাগোনা কমে এসেছে, অথচ একজন মানুষ তখনও জেগে আছে—না, চোখে নয়; জীবনের কঠিন বাস্তবতায়।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে মাটিতে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। গায়ে একটি পুরোনো শাড়ি। মাথার নিচে ছোট্ট কাপড়ের বালিশ। পাশে একটি পোটলা—হয়তো এটাই তার সমস্ত সম্বল। একজোড়া পুরোনো স্যান্ডেল, একটি লাঠি, আর একটি প্লাস্টিকের গামলায় রাখা পানির বোতল ও কিছু সামান্য জিনিসপত্র। মনে হয়, এই অল্প কয়েকটি জিনিসই তার পুরো পৃথিবী।

বয়স হয়তো ষাট পেরিয়েছে। মুখে সময়ের নির্মম আঁচড়, শরীরে ক্লান্তির ছাপ। সারাদিন তিনি কী খেয়েছেন, আদৌ খেতে পেরেছেন কি না—সেই খবর রাখার মানুষ হয়তো আর কেউ নেই। মাথার ওপর নেই কোনো ছাদ, অপেক্ষায় নেই কোনো আপনজন। দিনের শেষে তার ঠিকানা এই রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, আর আকাশটাই যেন তার একমাত্র ছাদ।

হয়তো একদিন তারও ছিল একটি সংসার। ছিল সন্তানের মুখ, ছিল হাসি-আনন্দে ভরা উঠোন। সময়ের নির্মম স্রোতে হারিয়ে গেছে সব। আজ তিনি সমাজের হাজারো ব্যস্ত মানুষের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য এক মানুষ। শত শত যাত্রী তার পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, কিন্তু খুব কম মানুষই থেমে জানতে চায়—“মা, আপনি কেমন আছেন?”

সভ্যতার অগ্রগতির গল্প আমরা প্রতিদিন বলি। উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে গর্ব করি। অথচ একটি অসহায় বৃদ্ধা যখন রেলস্টেশনের খোলা প্ল্যাটফর্মে বৃষ্টির রাতে ঘুমিয়ে থাকেন, তখন প্রশ্ন জাগে—আমাদের উন্নয়নের আলো কি তার কাছে পৌঁছেছে?

হয়তো এই বৃদ্ধা কোনো খবরের শিরোনাম হবেন না। কিন্তু তার নীরব ঘুম, তার পাশে পড়ে থাকা লাঠি আর ছোট্ট পোটলাটি আমাদের সমাজের এক কঠিন বাস্তবতার প্রতীক। মানবিকতার পরীক্ষা বড় বড় মঞ্চে নয়, এমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই।

হয়তো একটি উষ্ণ খাবার, একটি শুকনো কম্বল, একটু চিকিৎসা কিংবা একটি নিরাপদ আশ্রয়—এসবই বদলে দিতে পারে তার আগামী সকাল। কারণ, প্রতিটি মানুষেরই সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন