ফরিদপুর শহরের কোলাহল থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। পদ্মা নদী থেকে কুমার নদের উৎসমুখে অবস্থিত মদনখালী স্লুইস গেট। একসময় এটি ছিল মূলত পানি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে ফরিদপুরবাসীর অন্যতম জনপ্রিয় অবকাশ ও বিনোদন কেন্দ্রে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পদ্মার উত্তাল ঢেউ, স্লুইস গেট খুলে দেওয়ার সময় প্রবল বেগে কুমার নদে পানি প্রবেশের গর্জন, নদীর শীতল বাতাস আর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিদিনই টেনে আনে শত শত দর্শনার্থী। আর শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এখানে মানুষের ঢল নামে।
স্থানীয়দের ভাষায়, ফরিদপুরে পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো উন্মুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বিনোদনের জায়গা খুবই সীমিত। সেই অভাব অনেকটাই পূরণ করছে মদনখালী স্লুইস গেট এলাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের পর থেকেই পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ ভিড় করছেন এখানে। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, আবার কেউ বসে গল্পে মেতে উঠেছেন। শিশুদের হাসি, তরুণদের আড্ডা আর নদীর পানির গর্জন মিলিয়ে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
স্লুইস গেট দিয়ে পানি প্রবাহের দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। গেট খুলে দিলে পদ্মা নদীর পানি প্রবল স্রোতে কুমার নদে প্রবেশ করে। পানির সেই গর্জন আর সাদা ফেনার দৃশ্য মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। নদীতে ছোট ছোট নৌকার চলাচল এবং ভাসমান ভেলার দৃশ্য যেন গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে।
এই দর্শনার্থীদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট অস্থায়ী ব্যবসা। ঝালমুড়ি, বাদাম, চটপটি, আইসক্রিম, ভুট্টা, কোমল পানীয়সহ নানা ধরনের খাবারের দোকান বসে প্রতিদিন। ভাসমান নৌকাতেও বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন পণ্য। ফলে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকাও এখন এই পর্যটকসমাগমের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি চোখে পড়ে নানা অব্যবস্থাপনাও। এত মানুষের সমাগম হলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। নেই কোনো স্থায়ী বেঞ্চ। দর্শনার্থীদের বিশ্রাম নেওয়ার মতো কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুরো এলাকায় নেই পর্যাপ্ত ডাস্টবিন। ফলে বাদামের খোসা, ঝালমুড়ির প্যাকেট, প্লাস্টিক বোতল ও বিভিন্ন খাবারের উচ্ছিষ্ট যত্রতত্র ফেলে যাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। এতে যেমন পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি নদীর পানিও দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো নিরাপত্তার অভাব। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে এই এলাকায় পানিতে ডুবে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এরপরও এখানে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো হয়নি। এমনকি স্লুইস গেটের দুই পাশের অনেক নিরাপত্তা রেলিং ভেঙে থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি। অসাবধানতাবশত যে কেউ নদীতে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
ফরিদপুর শহরের সরকারি চাকরিজীবী আক্কাস মিয়া বলেন, “পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসার জন্য জায়গাটি খুবই সুন্দর। নদীর বাতাস আর পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে। তবে এখানে বসার ব্যবস্থা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।”
ভাসমান ঝালমুড়ি বিক্রেতা মাজেদ মোল্লা বলেন, “প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। ছুটির দিনে তো দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। এই জায়গার কারণে আমাদের মতো অনেকের সংসার চলছে।”
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এনায়েত হোসেন বলেন, “ফরিদপুরে এমন খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব কম। সন্তানদের নিয়ে এখানে আসতে ভালো লাগে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।”
দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী অন্তরা ইসলাম, যে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে এসেছে, সে বলে, “নদীর পানি আর নৌকা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। এখানে আবার আসতে চাই।”
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, “ফরিদপুরে তেমন কোনো বিনোদনের জায়গা নেই। তাই সপ্তাহজুড়ে কর্মব্যস্ত মানুষ ছুটির দিনে এখানে এসে কিছুটা স্বস্তি খোঁজেন। কিন্তু প্রতিবছরই এখানে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। গত বছরও তিনজন তরুণ সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তাই দ্রুত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, ভাঙা রেলিং সংস্কার এবং স্লুইস গেটের ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পানিতে নামা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “দর্শনার্থীদের জন্য স্থায়ী বেঞ্চ নির্মাণ, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন এবং বর্ষা মৌসুমে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলে মানুষ আরও নিরাপদে এখানে সময় কাটাতে পারবেন। এতে ছিনতাই, ইভটিজিং কিংবা অন্য অপরাধও কমবে।”
ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান বলেন, পর্যটন বা বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে কোনো স্থান জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সেখানে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, বিশ্রামাগার, আলোকসজ্জা এবং দর্শনার্থীদের সচেতনতা—সবকিছুই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নজর দিবেন এমনটাই আশা রাখছি।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজহারুল ইসলাম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “মদনখালী স্লুইস গেট এলাকায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ফরিদপুরের মানুষের কাছে মদনখালী স্লুইস গেট এখন শুধু একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নয়, বরং প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা স্বস্তি খোঁজার একটি প্রিয় ঠিকানা। তবে এই সৌন্দর্যকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তা নিশ্চিত করা গেলে মদনখালী স্লুইস গেট শুধু ফরিদপুর নয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় নদীকেন্দ্রিক বিনোদনস্থল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬ । ৫:২৮ অপরাহ্ণ