আপনার সঙ্গে কি সন্তানের দূরত্ব বাড়ছে? জেনে নিন কারণ ও সমাধান

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ । ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ

একসময় যে সন্তান দিনের প্রতিটি গল্প মা-বাবার সঙ্গে ভাগাভাগি করত, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সন্তানই যেন নিজের চারপাশে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে দেয়। পরিবারের চেয়ে বন্ধুরা হয়ে ওঠে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে, এমনকি একসঙ্গে সময় কাটাতেও অনীহা প্রকাশ করে। অনেক মা-বাবাই তখন ভাবতে শুরু করেন, ‘আমার সন্তান কি আর আগের মতো নেই?’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়ঃসন্ধিকাল ও কৈশোরে সন্তানদের মধ্যে এমন পরিবর্তন স্বাভাবিক। তবে কিছু আচরণ ও পারিবারিক পরিবেশ এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সময়মতো বিষয়টি বুঝতে পারলে সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক করা সম্ভব।

কেন দূরত্ব তৈরি হয়?

অতিরিক্ত শাসন ও নজরদারি

সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা, বারবার বকাঝকা করা বা গোপনে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলে সে নিজের ব্যক্তিগত পরিসর হারানোর অনুভূতি পায়। ফলে ধীরে ধীরে মা-বাবার কাছ থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে পারে।

অন্যের সঙ্গে তুলনা

‘ওর মতো হতে পারো না?’—এ ধরনের তুলনা সন্তানের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। বারবার তুলনার শিকার হলে সে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং পরিবার থেকে দূরত্ব তৈরি হয়।

পারিবারিক দ্বন্দ্ব

সন্তানকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের মতবিরোধ বা ঘন ঘন ঝগড়া তার মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। তখন সে নিজের অনুভূতি প্রকাশের বদলে নীরব হয়ে যায়।

বন্ধুদের প্রভাব

কৈশোরে বন্ধুদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। অনেক সময় ‘স্মার্ট’ বা স্বাধীন প্রমাণ করতে গিয়ে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেই পরিবার থেকে দূরে সরে যায়।

গোপনীয়তা রক্ষা

মা-বাবা অপছন্দ করেন এমন কোনো কাজে জড়িয়ে পড়লে বা এমন কিছু লুকানোর প্রয়োজন হলে সন্তান স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে।

নিজের আলাদা জগৎ

কৈশোরে নিজের চিন্তা, আগ্রহ ও সামাজিক পরিসর তৈরি হয়। তখন অনেকের কাছে বন্ধুদের গুরুত্ব পরিবারকে ছাড়িয়ে যায়। এই মানসিক পরিবর্তনও দূরত্বের একটি কারণ।

মানসিক চাপ বা আসক্তি

পড়াশোনা, সম্পর্ক, ব্যর্থতা কিংবা অন্য কোনো মানসিক চাপে থাকলে সন্তানের আচরণ বদলে যেতে পারে। একইভাবে মাদকাসক্তি বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।

মা-বাবার আচরণ

মা-বাবার নিজেদের মধ্যে সমস্যা, পারিবারিক অস্থিরতা বা সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়াও সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। শুধু আর্থিক চাহিদা পূরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, প্রয়োজন মানসম্মত সময় ও আন্তরিক যোগাযোগ।

কীভাবে কমবে দূরত্ব?

সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখতে ছোটবেলা থেকেই ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ জরুরি। বয়ঃসন্ধিকালে তাকে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে, আবার প্রয়োজন হলে পাশে থাকার আশ্বাসও দিতে হবে।

মা-বাবা ও সন্তান উভয়ের আন্তরিক চেষ্টা থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই মানসিক দূরত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মা-বাবার জন্য করণীয়

প্রতিদিন সন্তানের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটান।

নিজের মতামত বা সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেবেন না।

গোপনে সন্তানের ব্যাগ, মোবাইল বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তল্লাশি না করে সরাসরি কথা বলুন।

অযথা তর্ক বা বাদানুবাদ এড়িয়ে চলুন।

সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে যান, একসঙ্গে সিনেমা দেখুন বা বাইরে খেতে যান।

সন্তানের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করুন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করবেন না।

জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী বা বিশেষ দিনগুলোতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।

সন্তানের বন্ধুদের নিয়ে অযথা নেতিবাচক মন্তব্য করবেন না। তবে খারাপ সঙ্গ সম্পর্কে সচেতন করুন।

সন্তানেরও দায়িত্ব আছে

শুধু মা-বাবার নয়, সন্তানেরও দায়িত্ব রয়েছে সম্পর্ককে সুন্দর রাখার। জীবনের প্রতিটি বিষয় না হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুভূতি, সমস্যা বা সিদ্ধান্ত মা-বাবার সঙ্গে ভাগাভাগি করা উচিত। কারণ, বন্ধুরা জীবনের অংশ হলেও সংকটের সময়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় পরিবারই।

মনে রাখুন

কৈশোরে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই দূরত্ব যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা সন্তানের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিযোগ নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, আস্থা এবং খোলামেলা যোগাযোগ। একটি আন্তরিক কথোপকথনই অনেক সময় সম্পর্কের দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে।

সূত্র : কালবেলা

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন