ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আসিফ-উল আলমকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ ও ‘স্বাচিপের সক্রিয় সদস্য’ আখ্যা দিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে কলেজ শাখা ছাত্রদল। এ সময় অধ্যক্ষের যোগদানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা ও শিক্ষকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার অভিযোগও উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। পরে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবিতে অবস্থান নেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে একই প্রতিষ্ঠানের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আসিফ-উল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। উপসচিব দূর-রে-শাহওয়াজ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনটি সোমবার (১০ আগস্ট) জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে তাঁকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন পদে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ১৬ আগস্টের মধ্যে যোগদানের সময়সীমা উল্লেখ করা হয়।
প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে ডা. সৈয়দ আসিফ-উল আলম অধ্যক্ষ পদে যোগদান করতে কলেজে যান। এ সময় কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মুস্তাকীম কবিরের নেতৃত্বে ৭ থেকে ৮ জন নেতাকর্মী অধ্যক্ষের কার্যালয়ে উপস্থিত হন।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) ফরিদপুর জেলা শাখার কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ দাবির পক্ষে তাঁরা একটি তালিকাও প্রদর্শন করেন। অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর, স্বাচিপের সক্রিয় সদস্য’ লেখা ব্যানার টাঙিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান তাঁরা।
এ সময় অধ্যক্ষের যোগদানকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরিস্থিতির খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)সহ পুলিশ সদস্যরা কলেজে উপস্থিত হন।
পরে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. দিলরুবা জেবা দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আসিফ-উল আলম।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পক্ষের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান এবং পরে কার্যালয়ের সামনে ব্যানার নিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বক্তব্য দেন।
ছাত্রদল নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে পুনর্বাসন করা হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত নবনিযুক্ত অধ্যক্ষের নিয়োগ বাতিল করে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের কোনো শিক্ষককে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মুস্তাকীম কবির বলেন, “ফ্যাসিবাদের পতনের দীর্ঘ সময় পরও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একজনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বাচিপের সদস্য ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। গত ২৬ জুলাই তাঁকে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ শাখার আহ্বায়ক করা হলেও দুই দিনের মধ্যে সেই কমিটি বাতিল করা হয়। এরপর কীভাবে তাঁকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো, সেটি আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা দ্রুত এ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাই।”
তিনি আরও বলেন, “ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনর্বাসন বন্ধ করতে হবে।”
এ সময় ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইয়ামিন রেজা বর্ণ, সহ-সভাপতি সাজ্জাদুল ইসলাম, ছাত্রদল কর্মী ও ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. শাওন এবং বর্তমান শিক্ষার্থী সাফায়েত শিমুল বক্তব্য দেন।
তাঁরা বলেন, নবনিযুক্ত অধ্যক্ষের নিয়োগ বাতিল করে এমন একজন শিক্ষককে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত, যিনি রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে এবং জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধের প্রতি আস্থাশীল।
অন্যদিকে, ছাত্রদলের আনা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও যোগদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আসিফ-উল আলম।
তিনি বলেন, “আমার যোগদান সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ধরনের হট্টগোল হয়নি এবং কেউ আমাকে যোগদানে বাধা দেয়নি।”
দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এ দায়িত্ব দেওয়ার জন্য মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি যেন তাঁর মান-সম্মান রক্ষা করতে পারি এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে কাজ করতে পারি—এটাই আমার প্রত্যাশা।”
নবনিযুক্ত অধ্যক্ষের যোগদানকে কেন্দ্র করে কলেজে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এদিকে, অধ্যক্ষের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে ছাত্রদলের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে এ নিয়ে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নবনিযুক্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬ । ৯:২২ অপরাহ্ণ