‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬ । ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় থাকে, যেগুলো পেরিয়ে যাওয়ার পরও কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না। বয়স বাড়ে, চুলে পাক ধরে, কাঁধে দায়িত্ব জমে, জীবনের হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে ওঠে—তবুও হঠাৎ কোনো বৃষ্টিভেজা দুপুর, কাঁচা আমের টক গন্ধ কিংবা দূরের কোনো মাঠে শিশুদের হৈচৈ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর আগের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে। তখন মনে হয়, আহা! যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত সেই শৈশব!

আমাদের শৈশব ছিল না মোবাইলের পর্দায় বন্দি। ছিল না সারাদিনের ব্যস্ততার অজুহাত। আমাদের পৃথিবী ছিল বিশাল—যদিও সেই পৃথিবীটা ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম, কয়েকটি মাটির রাস্তা, সবুজ ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, পুকুর আর বিকেলের খেলার মাঠ নিয়ে।

সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙত। কখনো মা রাগ করে বলতেন, “আর কত ঘুমাবি? স্কুলে যাবি না?” চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা থেকে উঠতাম। তাড়াহুড়ো করে মুখ ধুয়ে, কখনো অর্ধেক ভাত খেয়ে, বই-খাতা বগলে নিয়ে ছুটতাম স্কুলের দিকে। পথে দেখা হতো বন্ধুদের সঙ্গে। তারপর শুরু হতো দৌড় প্রতিযোগিতা—কে আগে স্কুলে পৌঁছাতে পারে!

কিন্তু স্কুলে যাওয়ার পথটা কখনোই শুধু স্কুলে যাওয়ার পথ ছিল না। রাস্তার পাশের গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়ার পরিকল্পনা, কার পুকুরে আজ মাছ ধরতে নামা যাবে, বিকেলে কোথায় ক্রিকেট খেলা হবে—সব সিদ্ধান্ত হয়ে যেত সেই পথেই। কোনোদিন শিক্ষক দেখলে ভয়ে দৌড়ে ক্লাসে ঢুকতাম, আবার কোনোদিন বৃষ্টির কারণে স্কুল ছুটি হলে আনন্দে মনে হতো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ আজ আমাদের হাতে এসে ধরা দিয়েছে।

বর্ষার দিনগুলো ছিল আরও অন্যরকম। আকাশ কালো হয়ে এলেই মন নেচে উঠত। বৃষ্টি নামলেই বই-খাতা ফেলে ছুটে যেতাম উঠানে। মা যতই বকুন, “বৃষ্টিতে ভিজিস না, জ্বর হবে”—আমাদের কে শোনে কার কথা! টিনের চাল থেকে ঝরে পড়া পানির নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করা, কাদার মধ্যে ফুটবল খেলা, রাস্তার জমে থাকা পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো—এসবের মধ্যে যে আনন্দ ছিল, আজকের দামী বিনোদনেও তা খুঁজে পাওয়া যায় না।

শীতের সকালেও ছিল অন্যরকম উন্মাদনা। কুয়াশা ভেদ করে স্কুলে যাওয়া, খেজুরের রস খাওয়া, মাঠে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে দৌড়ানো—সবকিছুই ছিল এক অদ্ভুত সুখে ভরা। কখনো কারও বাড়ির গাছ থেকে বরই পেড়ে পালিয়েছি, আবার ধরা পড়ে কান মলে ক্ষমাও চেয়েছি। সেই সময় অপরাধও ছিল নিষ্পাপ। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি খেয়ে একটু কেঁদেছি, তারপর আবার ভাত খেয়ে সব ভুলে গেছি।

বিকেল ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময়। স্কুল থেকে ফিরে কোনোমতে বইখাতা ছুড়ে রেখে মাঠের দিকে ছুটতাম। কেউ ফুটবল নিয়ে আসত, কেউ ক্রিকেটের ব্যাট। বল না থাকলে মোজা গুটিয়ে বল বানানো হতো। ব্যাট না থাকলে গাছের ডালই যথেষ্ট ছিল। খেলার নিয়ম নিয়ে ঝগড়া হতো, কেউ আউট মানতে চাইত না, কেউ রাগ করে বাড়ি চলে যেত। কিন্তু একটু পরেই আবার তাকে ডাকতে যেতাম—“আয় রে, তুই না খেললে খেলা জমে না।”

সন্ধ্যা নামলে বাড়ি ফেরার সময় হতো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, পাখিরা গাছে ফিরত, আর মায়েদের ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত—“কোথায় গেলি? বাড়ি আয়!” তবুও আমরা আরও পাঁচ মিনিট খেলার জন্য অনুরোধ করতাম। সেই পাঁচ মিনিট কখনো শেষ হতো না।

রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আনন্দ যেন আরও বেড়ে যেত। উঠানে বসে গল্প, ভূতের ভয়, দাদী-নানীর মুখে রাজা-রানীর গল্প—সবকিছু মিলে অন্য এক পৃথিবী। কখনো জোনাকি পোকা ধরে হাতের মুঠোয় রাখতাম। তারপর আবার ছেড়ে দিতাম অন্ধকারে। জোনাকির ছোট্ট আলো দেখে মনে হতো, রাতের আকাশের তারাগুলো বুঝি মাটিতে নেমে এসেছে।

আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেই গ্রামের পথ হয়তো বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, খেলার মাঠে উঠেছে বাড়ি, পুকুর ভরাট হয়েছে। সেই বন্ধুরা কেউ চাকরি নিয়ে শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে মন খারাপ হতো, আজ তাদের সঙ্গে দেখা হয় বছরের পর বছর পর।

কখনো পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে আমরা হাসতে হাসতে বলি, “মনে আছে, সেদিন তুই গাছে উঠে আটকে গিয়েছিলি?” কিংবা “মনে আছে, বৃষ্টির মধ্যে খেলতে গিয়ে কাদায় পড়ে কী অবস্থা হয়েছিল?”

তারপর হঠাৎ করেই হাসির আড়ালে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে।

কারণ আমরা দুজনেই জানি—সেই দিনগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

শৈশব আসলে জীবনের এমন এক ঋতু, যেখানে হারানোর ভয় ছিল না, ভবিষ্যতের চিন্তা ছিল না, পকেটে টাকা না থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না। একটি বিকেল, কয়েকজন বন্ধু আর একটু খোলা মাঠ—এই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজ আমরা বড় হয়েছি। হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসংখ্য সুযোগ, জীবনে অনেক দায়িত্ব। তবুও কখনো কখনো মন চায় সবকিছু ফেলে আবার সেই মাটির রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে। বৃষ্টিতে ভিজতে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে। মায়ের বকুনি খেতে। সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত মাঠে খেলতে।

কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। সে কাউকে ফিরে যেতে দেয় না।

তবুও সেই দুরন্ত শৈশব আমাদের ভেতরে কোথাও রয়ে গেছে। পুরোনো কোনো গানের সুরে, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে, কাঁচা আমের গন্ধে কিংবা গ্রামের পথের ধুলোর মধ্যে সে হঠাৎ জেগে ওঠে।

আর তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।

মনে হয়, দূরে কোথাও ছোট্ট একটি ছেলে এখনও দৌড়ে যাচ্ছে—খালি পায়ে, ধুলো উড়িয়ে, বন্ধুদের ডাকতে ডাকতে।

সেই ছেলেটি হয়তো আর কেউ নয়।

সেই ছেলেটি—আমি।

আর তার পেছনে পড়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে নির্ভার, সবচেয়ে দুরন্ত সময়–সেই শৈশব।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন