দুপুরের ভাপসা গরম। শহরের ব্যস্ত সড়কে রোদের তাপে যেন পুড়ছে পিচঢালা পথ। মানুষের শরীর দরদর করে ঘামে ভিজে যাচ্ছে। প্রকৃতির গায়ে আজ দখিনা হাওয়ার কোনো ছোঁয়া নেই বললেই চলে।
এমনই এক দুপুরে একটি কাজে ফরিদপুর পুলিশ লাইন্স থেকে সোনালী ব্যাংকের কর্পোরেট শাখায় যাওয়ার জন্য একটি রিকশায় উঠলাম। রিকশার চালকের নাম শাহজাহান।
বয়স ৫০ ছুঁইছুঁই। প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে ঘামে ভিজে যাচ্ছে তার শার্ট। তবুও মুখে ক্লান্তির কোনো অভিযোগ নেই। পথ চলতে চলতেই শুরু হলো গল্প।
শাহজাহানের বাড়ি ফরিদপুর শহরের মুন্সিবাজার এলাকায়। সংসারে রয়েছে চার বছরের একটি ছেলে আর দুই বছরের একটি মেয়ে। ছোট্ট দুটি সন্তানকে ঘিরেই এখন তার সব স্বপ্ন। তাদের পড়ালেখা, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা—এসব ভাবনাই যেন প্রতিদিন তাকে নতুন করে রিকশার প্যাডেলে শক্তি দেয়।
তবে শাহজাহানের জীবন এতটা সহজ ছিল না।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান তিনি। বাবার মৃত্যুতে শুধু একজন অভিভাবকই হারাননি, হারিয়ে যায় তার পড়ালেখার স্বপ্নও। সংসারের হাল ধরতে বই-খাতা তুলে রাখতে হয়। খুব অল্প বয়সেই নামতে হয় জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে।
শুরু করেন রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে।
ইট টানা, বালু তোলা, সিমেন্ট মেশানো—অন্যের নির্দেশে দিনের পর দিন কাজ করেছেন। ধীরে ধীরে শিখেছেন নির্মাণকাজের নানা খুঁটিনাটি। একসময় সহকারী থেকে হয়ে ওঠেন পূর্ণাঙ্গ রাজমিস্ত্রি।
কেটে যায় দীর্ঘ ১৭ বছর।
কিন্তু একসময় সেই পেশার ভেতরের কিছু বাস্তবতা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। কাজের জায়গায় ইট, বালু, সিমেন্ট কিংবা শ্রমিকের হিসাব নিয়ে নানা ধরনের অসততা দেখতে দেখতে তার ভেতরে জন্ম নেয় অস্বস্তি।
শেষ পর্যন্ত তিন বছর আগে ছেড়ে দেন ১৭ বছরের পরিচিত পেশা।
তারপর হাতে নেন রিকশার হ্যান্ডেল।
শাহজাহান বললেন, “রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে হলে সেখানে বালু, ইট, সিমেন্ট আর শ্রমিকের কাজে চলে কৌশলী শুভঙ্করের ফাঁকি। এটা যখন বুঝতে পারলাম, তখন পেশাটি ছেড়ে দিলাম। এখন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। কষ্ট হচ্ছে, তবুও আমার টাকাটা হালাল। এটাই আমার শান্তি।”
কথাগুলো বলতে বলতে প্যাডেলে চাপ বাড়ান তিনি।
রিকশাটি এগিয়ে চলে ব্যস্ত শহরের পথে। চারপাশে মানুষের ছুটে চলা, গাড়ির হর্ন, দোকানের ব্যস্ততা। আর সেই ভিড়ের মধ্যেই একজন মানুষ ঘাম ঝরিয়ে চলেছেন নিজের ছোট্ট সংসারটাকে টিকিয়ে রাখতে।
হয়তো এই রিকশার আয় খুব বেশি নয়। প্রতিদিনের আয় দিয়ে চাল, ডাল, সন্তানের দুধ, বাসাভাড়া—সব সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। অসুস্থ হলে আয় বন্ধ। বৃষ্টি হলে যাত্রী কমে যায়। প্রচণ্ড গরমে প্যাডেল ঘোরানোও কষ্টকর হয়ে ওঠে।
তারপরও শাহজাহান ফিরে যেতে চান না আগের পেশায়।
কারণ তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু বেশি টাকা নয়। তার চেয়েও বড় প্রাপ্তি—স্বচ্ছ বিবেক।
ফরিদপুরের সেই ভাপসা দুপুরে রিকশা থেকে নেমে মনে হলো, শহরের রাস্তায় প্রতিদিন কত মানুষকে আমরা পাশ কাটিয়ে যাই। কারও হাতে রিকশার হ্যান্ডেল, কারও কাঁধে বোঝা, কেউ রোদে দাঁড়িয়ে দিনমজুরি করেন।
তাদের অনেকেরই হয়তো আছে শাহজাহানের মতো না বলা গল্প।
শাহজাহানের গল্পটাও হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু তার কথাগুলো অসাধারণ—
“কষ্ট হচ্ছে, তবুও আমার টাকাটা হালাল। এটাই আমার শান্তি।”
হয়তো জীবন তাকে বড় কোনো সম্পদ দিতে পারেনি। কিন্তু ৫০ ছুঁইছুঁই বয়সে শাহজাহান বুঝে গেছেন—ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা যায়, কিন্তু অসততার বোঝা নিয়ে শান্তিতে ঘুমানো যায় না।
আর তাই দুপুরের প্রচণ্ড রোদে, ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ফরিদপুরের পথে পথে প্যাডেল ঘোরানো এই মানুষটির সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি শুধু একজন রিকশাচালক নন।
তিনি একজন সৎ উপার্জনের যোদ্ধা।
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ । ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ