আধুনিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ এবং অলস জীবনযাত্রার কারণে বর্তমান নগর জীবনে বড় যে স্বাস্থ্য সংকটটি দেখা দিয়েছে, তা হল যকৃৎ বা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা— যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ফ্যাটি লিভার’ বা ‘এনএএফএলডি’ বলা হয়।
লিভারে মেদ জমলে তা অলক্ষ্যেই শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিপাক ক্রিয়াকে অবশ করে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
ফ্যাটি লিভার সমস্যায় ঘরোয়া নিরাময় হিসেবে, ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও রূপচর্চার বাজারে গাঢ় লাল রংয়ের ‘বিটরুট’ বা বিটের জুস পানের প্রচারণা দেখা যায়।
‘হেলথ ডটকম’ ও ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এর প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, বিটের জুস সরাসরি কোনো জাদুকরী ওষুধ নয়; তবে এতে থাকা বিশেষ খনিজ উপাদান লিভারের চর্বি গলিয়ে কোষে নতুন করে প্রাণ ফেরাতে ভূমিকা রাখে।
‘বেটেইন’ ও লিভারের চর্বি কাটার বিজ্ঞান
মার্কিন পুষ্টিবিদ জিলিয়ান কুবাল্লা বলেন, “বিটরুটের গাঢ় লাল রংয়ের প্রধান উৎস হল, এর ভেতরে থাকা ‘বেটেইন’ নামক শক্তিশালী ‘নাইট্রোজেনাস’ যৌগ। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই বেটেইন উপাদান লিভারের কোষগুলোতে অতিরিক্ত লিপিড বা চর্বি জমা হওয়ার প্রক্রিয়াকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।”
এটি লিভারের ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ কমিয়ে ফ্রি-র্যাডিক্যাল ধ্বংস করার পাশাপাশি ধমনী থেকে ক্ষতিকর চর্বি বের করে দিয়ে লিভারের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে।
‘নাইট্রেট’ এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি
বিজ্ঞান বলছে, বিটের জুসে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক ‘নাইট্রেট’ থাকে, যা চিবানো বা পানের পর মানুষের মুখের লালার সঙ্গে মিশে ‘নাইট্রিক অক্সাইড’ গ্যাসে রূপান্তরিত হয়।
এই নাইট্রিক অক্সাইড মূলত লিভারের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে শিথিল বা ‘রিল্যাক্সড’ করে দেয়, ফলে যকৃতে রক্ত ও অক্সিজেনের সঞ্চালন বেড়ে যায়।
লিভারের উন্নত রক্ত সঞ্চালন, এর অভ্যন্তরীণ প্রদাহ শান্ত করতে এবং ‘হেপাটিক স্টিয়াটোসিস’ বা চর্বির মাত্রা কমাতে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
লিভার এনজাইম স্বাভাবিক করা
জিলিয়ান কুবাল্লা বলেন ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ‘হেপাটোলজি’ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন একটানা ১২ সপ্তাহ বা ৩ মাস নিয়মিত, পরিমিত পরিমাণে বিটের রস বা নির্যাস গ্রহণ করেছেন, তখন তাদের রক্ত পরীক্ষায় লিভারের ক্ষতিকর এনজাইম, যেমন- ‘এএলটি’ এবং ‘এএসটি’-এর মাত্রা নাটকীয়ভাবে স্বাভাবিক সীমারেখায় নেমে এসেছে।”
এটি লিভারের কোষের অকাল ক্ষয় সরাসরি রোধ করতে সহায়তা করে।
বিটের রস তৈরির বৈজ্ঞানিক নিয়ম ও পরিমাণ
বিটের সর্বোচ্চ পুষ্টিগুণ বজায় রাখার পাশাপাশি এর সিট্রাস উপাদান অক্ষুণ্ণ রাখতে চিকিৎসকেরা একটি বিশেষ পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন।
রেসিপি ও মেশানোর পদ্ধতি: ১টি মাঝারি আকারের কাঁচা বিটরুট ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে নিতে হবে। এবার বেন্ডারে সামান্য বিশুদ্ধ পানি এবং সঙ্গে ১ চা-চামচ তাজা লেবুর রস ও সামান্য আদা কুচি দিয়ে ব্লেন্ড করতে হবে।
লেবুর ভিটামিন-সি বিটের আয়রন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টকে মস্তিস্ক ও লিভারে সহজে শোষণ হতে সাহায্য করে।
পরিমাপ: লিভারের সুরক্ষায় সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ দিন সকালে খালি পেটে বা নাস্তার সঙ্গে ১ গ্লাস (প্রায় ২০০ মিলি) তাজা বিটের জুস পান করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত পানে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিট জুসের সঙ্গে লেবু ও আদার মিশ্রণের উপকারিতা
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু বিটের রসের চেয়ে এর সঙ্গে তাজা লেবুর রস এবং আদা কুচি মিশিয়ে গ্রহণ করলে লিভার, ধমনী এবং মেটাবলিজমের ওপর ‘সিনার্জিস্টিক’ বা সম্মিলিত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ ডা. এলিজাবেথ রবিনসন এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকেরা এই মিশ্রণের ৩টি বড় বৈজ্ঞানিক সুফল এবং ২টি ক্ষতিকর অপকারিতা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন।
আয়রন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের শোষণ
ডা. এলিজাবেথ রবিনসন ব্যাখ্যা করেন, “বিটরুটে প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিজ্জ আয়রন বা ‘নন-হেম আয়রন’ এবং ‘বেটালাইন’ নামক শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে।”
মানুষের শরীর প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভিজ্জ আয়রন, সহজে শুষে নিতে পারে না। তবে বিটের রসের সঙ্গে যখন লেবুর তাজা রস মেশানো হয়, তখন লেবুর উচ্চ মাত্রার ভিটামিন-সি বিটের নন-হেম আয়রনের রাসায়নিক রূপ পরিবর্তন করে তাকে ‘ফেরাস’ আয়রনে রূপান্তর করে।
এই ফেরাস রূপটি মানুষের পরিপাকতন্ত্রে চার গুণ দ্রুত ও সহজে শোষিত হয়, যা রক্তস্বল্পতা নিমেষেই দূর করে।
ফ্যাটি লিভারের প্রদাহ ও পিত্তরসের ক্ষরণ দ্বিগুণ নিঃসরণ
পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, আদার ভেতরে থাকা প্রধান সক্রিয় বায়ো-অ্যাক্টিভ যৌগ ‘জিঞ্জেরল’ এবং লেবুর ‘সিট্রিক অ্যাসিড’ লিভারে গিয়ে পিত্তরস বা বাইল জুস নিঃসরণের গতি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই পিত্তরস ধমনী ও লিভারের কোষে জমে থাকা শক্ত চর্বির কণাগুলোকে ভেঙে তরল করে শরীর থেকে ছেঁকে বের করে দেয়। ফলে ফ্যাটি লিভারের রোগীদের লিভার এনজাইম সাধারণের চেয়ে অনেক দ্রুত স্বাভাবিক সীমারেখায় নেমে আসে।
রক্তনালী পরিষ্কার ও ধমনীর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
বিটের নিজস্ব নাইট্রেট মুখের লালার সঙ্গে মিশে যে ‘নাইট্রিক অক্সাইড’ তৈরি করে, সেটার সঙ্গে লেবুর পটাসিয়াম এবং আদার প্রদাহরোধী উপাদান মিশে আরও বেশি সময় সচল রাখতে সাহায্য করে।
এটি রক্তনালীর দেয়ালগুলোকে পরিষ্কার রাখে এবং স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়, যার ফলে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
কড়া অপকারিতা ও চিকিৎসকদের বিশেষ সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের হেপাটোলজিস্ট (লিভার বিশেষজ্ঞ) ডা. ক্রিস্টিনা ক্যাটালানো বলেন, “মিশ্রণটি সুস্থ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হলেও, কিছু সুনির্দিষ্ট শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।”
তীব্র গ্যাস্ট্রিক ও দাঁতের এনামেল ক্ষয়: বিটের রসের তীব্র ক্ষার এবং লেবুর রসের কড়া অ্যাসিডের মেলবন্ধনে যাদের পরিপাকতন্ত্র দুর্বল, তাদের খালি পেটে এটি পানের পর তীব্র বুক জ্বালাপোড়া, পেট মোচড়ানো কিংবা অ্যাসিড রিফ্লাক্স হতে পারে।
তাছাড়া নিয়মিত সরাসরি সিট্রাস জুস পানে দাঁতের প্রতিরক্ষামূলক সাদা এনামেল স্তর চিরতরে ক্ষয়ে যেতে পারে; তাই এই জুস সবসময় স্ট্র দিয়ে পান করা এবং পানের পর সাধারণ পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলা আবশ্যক।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য গ্লুকোজ স্পাইক: বিটরুটে প্রাকৃতিকভাবেই শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে। এর সঙ্গে যদি স্বাদের জন্য আপেল বা গাজরের রস মেশানো হয়, তবে এর আঁশ নষ্ট হয়ে তরল ফ্রুক্টোজ রক্তে মিশে ডায়াবেটিসের রোগীদের রক্তের শর্করার মাত্রা হঠাৎ বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়িয়ে দিতে পারে।
রক্ত পাতলা করার ওষুধের সঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাব: আদা প্রাকৃতিকভাবেই রক্তকে কিছুটা পাতলা করতে সাহায্য করে। যারা স্ট্রোক বা হার্টের ব্লকের কারণে আগে থেকেই চিকিৎসকের দেওয়া ‘অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট’ থেরাপির ওষুধ খাচ্ছেন, তারা অতিরিক্ত আদা-বিটের জুস খেলে রক্ত অতিরিক্ত পাতলা হয়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অক্সালেট ও কিডনি পাথরের ঝুঁকি
ডা. ক্রিস্টিনা ক্যাটালানো কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, “বিটরুটে প্রচুর পরিমাণে ‘অক্সালেট’ থাকে। তাই যাদের শরীরে ইউরিক অ্যাসিড বেশি বা যাদের কিডনিতে পাথর বা ‘স্টোন’ হওয়ার পূর্ব ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য বিটের জুস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।”
রক্তে সুগারের হঠাৎ বৃদ্ধি: বিটে প্রাকৃতিকভাবেই শর্করার পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে, তাই ডায়াবেটিসের রোগীরা কড়া মিষ্টি উপাদান বা মধু না মিশিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত খেতে হবে।
রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া: যারা উচ্চ রক্তচাপের নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন, তারা অতিরিক্ত বিটের জুস খেলে এর নাইট্রিক অক্সাইড রক্তচাপকে হুট করে বিপজ্জনক মাত্রায় নামিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি লিভারের টক্সিন প্রস্রাবের মাধ্যমে সহজে ছেঁকে বের করতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে
কোনো পানীয়ই রাতারাতি ফ্যাটি লিভার সারাতে পারে না, যদি না দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে প্রক্রিয়াজাত চিনি, ডালডা, তেল ও অতিরিক্ত ফাস্টফুড পুরোপুরি বর্জন করা হয়।
আমেরিকান লিভার ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকদের মতে, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা, সঠিক সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং পরিমিত বিটের জুস পানের মিলিত সমন্বয়ে লিভারকে চর্বিমুক্ত ও রোগমুক্ত রাখা সম্ভব।
সূত্র : বিডিনিউজ২৪

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ । ৮:১১ পূর্বাহ্ণ