মেয়াদ শেষ, তবু ‘সভাপতি’: ফরিদপুরে মসজিদের ৬০ মেহগনি গাছ বিক্রির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ । ৭:৩৭ অপরাহ্ণ

ফরিদপুর সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের ঘোড়াদহ এলাকায় হাজী মো. হোসেন উদ্দিন মুন্সী ওয়াকফ এস্টেট জামে মসজিদের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সাবেক সভাপতি মো. মাসুদ মোল্লার (৬৫) বিরুদ্ধে মসজিদের উন্নয়নের কথা বলে ৬০ থেকে ৭০টি মেহগনি গাছ বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ, মুয়াজ্জিনকে চাকরিচ্যুত এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মসজিদের কোনো রেজুলেশন ও টেন্ডার ছাড়াই এসব গাছ বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের মুয়াজ্জিন আবু তালেব মোল্যাকে অসুস্থতার অজুহাতে চাকরিচ্যুত করে নিজের চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলামকে মুয়াজ্জিন হিসেবে সরকারি অনুদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে খাদেমের সরকারি অনুদানের তালিকায় নিজের নামও অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

এদিকে মসজিদটির ইমাম ও সভাপতির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গত ২০২৬ সালের ৫ মে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ওয়াকফ পরিদর্শক কার্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দেন মসজিদটির সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।

জানা গেছে, এক একরের বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ মসজিদের নামে প্রায় ১২ বিঘা জমি রয়েছে। এসব জমি থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।

২০২১ সালের ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন মাসুদ মোল্লাকে সভাপতি করে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি তিন বছরের জন্য অনুমোদন দেয়। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট। এরপর ওয়াকফ প্রশাসন নতুন কোনো কমিটি অনুমোদন না দিলেও মাসুদ মোল্লা নিজেকে সভাপতি দাবি করে মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এলাকাবাসীর দাবি, মসজিদের জমি থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি অংশ দিয়ে ইমামকে মাসে ১০ হাজার এবং মুয়াজ্জিনকে ৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বাকি অর্থের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। এ অর্থ মাসুদ মোল্লা ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মসাৎ করছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

কৈজুরী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. সেলিম মোল্লা বলেন, সরকারের অনুমোদিত কমিটির মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। এরপর তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কমিটির সদস্যরা একে একে সরে যান। নতুন কোনো নিয়মতান্ত্রিক কমিটি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ তিনি নিজেকে সভাপতি দাবি করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, “মাসুদ মোল্লার সঙ্গে আমাদের এখন কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি একাই সভাপতি দাবি করে যা খুশি করছেন। এলাকায় তার প্রভাবের কারণে অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে চান না।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মসজিদ কমিটির সাবেক সভাপতি মো. মাসুদ মোল্লা বলেন, “আমাদের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কমিটি গঠনের জন্য সদস্যদের একটি তালিকা বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো নতুন কমিটির অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করেই মসজিদের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য মেহগনি গাছ বিক্রি করা হয়েছে। গাছগুলো ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয় এবং ওই টাকা সম্পূর্ণ মসজিদের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা হয়েছে। মসজিদের জমি থেকে প্রতিবছর যে আয় হয়, সেখান থেকে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের মাসিক বেতনসহ মসজিদের বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহ করা হয়।”

অভিযোগের বিষয়ে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ওয়াকফ পরিদর্শক কার্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষক ইয়াকুব আলী সোহাগ বলেন, “আমি ২০২৫ সালে ফরিদপুরে যোগদান করেছি। যোগদানের পর ওই মসজিদের কোনো কমিটি হয়নি। আগের কমিটির মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। এখন কেউ নতুন কমিটি গঠন করে থাকলে তা আইনসিদ্ধ কি না, যাচাই করতে হবে। মেহগনি গাছ বিক্রির বিষয়েও আমাদের কিছু জানানো হয়নি। খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।”

এ বিষয়ে জেলা ওয়াকফ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া বলেন, “ওয়াকফের সরকারি মসজিদের কোনো গাছ রেজুলেশন ও টেন্ডার ছাড়া বিক্রি করা অপরাধ। অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কমিটি গঠন এবং সরকারি ভাতার তালিকায় মুয়াজ্জিন ও খাদেম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। অন্যান্য অভিযোগও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন