পদ্মার নির্মম ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৪টি দুর্গম চরের হাজার হাজার মানুষ। তীব্র স্রোতে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বহু সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো। এতে এলাকাটিতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ভিটেমাটি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে শত শত পরিবার।
সম্প্রতি এলাকাটিতে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে জীবন-জীবিকা রক্ষা ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের দাবিতে আশ্রয়ণের ঘরের সামনেই মানববন্ধন করেন ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জীবনজুড়ে নিত্য সংগ্রাম। বর্ষায় বন্যা আর নদীভাঙন, আবার শুষ্ক মৌসুমে মাইল কে মাইল হেঁটে ট্রলার ঘাটে পৌঁছাতে হয় তাদের। তবে এবারের নদীভাঙন তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে।
নর্থচ্যানেল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোস্তফা হোসেন জানান, পদ্মার তীব্র তোড়ে গত কিছুদিন ধরে অব্যাহত ভাঙনে নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলদ ও বনজ গাছপালাসহ নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে প্রায় ৭০০ বিঘা উর্বর ফসলি জমি। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিআরডি) প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক এমনকি ১০টি আশ্রয়ণের ঘরও পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক পরিবার অতীতেও একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় মজিবর মোল্লা বলেন, “ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি পদ্মার পেটে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে অনেক পরিবার তড়িঘড়ি করে বসতভিটা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি।”
জয়নাল মাতুব্বর ডাঙ্গীর বাসিন্দা মো. হিরু শেখ বলেন, “নর্থচ্যানেল ইউপির জয়নাল মাতুব্বর ডাঙ্গী, কবিরপুর ব্রিজ সড়ক এবং কবিরপুর এলাকাসহ প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা ও কাঁচা সরকারি সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ব্রিজ, কালভার্ট, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও কমিউনিটি ক্লিনিক নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা একেবারেই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে কেবলই ভিটেমাটি হারা মানুষের হাহাকার আর আর্তনাদ। গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলো বাঁধের ওপর ও খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টাঙিয়ে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
আক্ষেপ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা চায়না বেগম বলেন, “চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সংসার আর জমিজমা পদ্মায় তলিয়ে গেল। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা বাঁচতে চাই। নদীভাঙন বন্ধে স্থায়ী বাঁধ না হলে মানচিত্র থেকেই আমাদের নাম মুছে যাবে।”
ভাঙনের শিকার হায়দার আলী জানান, পরিস্থিতি দিন দিন আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। পদ্মার অব্যাহত আগ্রাসন থেকে বাকি গ্রামগুলো রক্ষা করতে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ দরকার। তারা সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানান— জরুরি ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলা ও স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণ করা, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাসজমি বরাদ্দসহ কৃষিঋণ মওকুফ ও আর্থিক অনুদান দেওয়া।
ক্ষতির ভয়াবহতা তুলে ধরে নর্থচ্যানেল ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মোফাজ্জল হোসেন এবং ডিক্রিরচর ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. হায়দার আলী খান বলেন, “হঠাৎ নদীভাঙনে বিঘা বিঘা জমি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হারিয়ে এই এলাকায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। নদীপাড়ের কৃষকদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে মানুষ এখন নিঃস্ব। ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে তারা অমানবিক দিন কাটাচ্ছে।”
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, “আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙন প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনা ভাবা হচ্ছে।”
প্রকৃতির এই নির্মম তাণ্ডবে দিশেহারা ফরিদপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এখন স্থায়ী সমাধান ও দ্রুত সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:৩১ অপরাহ্ণ