একই মন্দির প্রাঙ্গণে সারি সারি সাজানো ২৭৭টি প্রতিমা। কোথাও দেবী দুর্গার নবদুর্গা রূপ, আবার কোথাও ফুটে উঠেছে মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলার উপাখ্যান। পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় আখ্যানের এমন শৈল্পিক উপস্থাপনায় ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার এক পূজামণ্ডপ এখন দর্শনার্থীদের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
উপজেলার কুসুমদি গ্রামের শ্রী শ্রী হরি মন্দিরের এ ব্যতিক্রমী শারদীয় দুর্গোৎসব দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। ফরিদপুর ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। আয়োজকদের দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও ভক্তরা এ চমৎকার আয়োজন দেখতে আসছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে সারি সারি প্রতিমা সুবিন্যস্তভাবে সাজানো। প্রতিটি প্রতিমায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা পৌরাণিক আখ্যান। নির্মাণশৈলী, বৈচিত্র্যময় সাজসজ্জা আর নান্দনিক উপস্থাপনা রূপ নিয়েছে এক অনবদ্য শিল্পকর্মে। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রতিমা ঘুরে দেখছেন, আবার কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে তুলছেন ছবি ও ভিডিও। সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৫ সাল থেকে এখানে নিয়মিত দুর্গোৎসব আয়োজিত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিসর ও জনপ্রিয়তা দুই-ই বেড়েছে। গত বছর এখানে ২৫১টি প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছিল, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭৭টিতে।
কাশিয়ানী থেকে আসা দর্শনার্থী দীপালী রানী বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো প্রতিমা দেখে ভীষণ ভালো লাগছে। প্রতিটি প্রতিমায় আলাদা আলাদা গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছি, সত্যিই এক দারুণ অনুভূতি।”
মধুখালী থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী বিনয় কুমার জানান, প্রতিমাগুলোর নির্মাণশৈলী এক কথায় অসাধারণ। দূর থেকে এসেও এমন আয়োজন দেখে মন ভরে গেছে। এই আয়োজন বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরি করেছে।
আলফাডাঙ্গা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও প্রভাষক প্রবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, “এটি আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ। ২৭৭টি প্রতিমার মাধ্যমে পৌরাণিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। আমরা চাই, সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এই উৎসব আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিক।”
চলতি বছর ফরিদপুর জেলার মোট ৭৮১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, এর মধ্যে ১৪৭টি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং ২৪৭টি মণ্ডপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সার্বিক আয়োজনের দিক থেকে আলফাডাঙ্গার এই মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মন্দিরজুড়ে নেওয়া হয়েছে নিচ্ছদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি মোতায়েন রয়েছে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল সরোয়ার জানান, পূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দর্শনার্থীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে প্রতিমা দর্শন করতে পারেন, সে জন্য পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ