দেখা যায় না পথ, তবু থামে না পেটের দায়

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ৮:০৯ পিএম

ঘন কুয়াশায় ঢাকা একটি গ্রামীণ সড়ক। চারপাশে নীরবতা, কেবল চাকার ঘর্ষণ আর নিঃশ্বাসের শব্দ। সেই সড়ক দিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি পুরোনো ঠেলাগাড়ি। গাড়ির পেছনে ঝুঁকে আছেন এক গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ। মাথায় মলিন কাপড় জড়ানো, পরনে লুঙ্গি ও শীত আটকানোর সামান্য ব্যবস্থা। কুয়াশার ভেতর দিয়ে তিনি ঠেলে নিচ্ছেন জীবনের ভার।

গাড়ির ওপর স্তূপ করে রাখা সবুজ ঘাস—কখনো গবাদিপশুর খাদ্য, কখনো বাজারে বিক্রির পণ্য। এই ঘাসই তাঁর দিনের আয়, পরিবারের একবেলার নিশ্চয়তা। শীতের সকাল তাঁর কাছে রোমান্টিক নয়, বরং কঠিন বাস্তবতার আরেকটি অধ্যায়। যখন শহরের মানুষ গরম চা হাতে শীত উপভোগ করেন, তখন এই মানুষগুলো লড়াই করেন দিনটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

স্থানীয়দের ভাষায়, এমন মানুষদের সকাল শুরু হয় ভোরের আজানের আগেই। নদীর ধারে, চরাঞ্চলে বা খালের পাড়ে কাটা ঘাস জড়ো করে তা বিক্রি করাই তাঁদের পেশা। কুয়াশা, শীত, বৃষ্টি—কোনো কিছুই কাজ থামিয়ে রাখতে পারে না। কাজ থামলে থেমে যায় হাঁড়ির আগুন।

ছবির মানুষটির সামনে সোজা রাস্তা নেই—আক্ষরিক অর্থেই। সড়ক ভাঙা, চারপাশে জলাশয়, কুয়াশায় দৃষ্টিসীমা সীমিত। তবু তিনি থামেন না। কারণ থামা মানেই হার মানা। এই লড়াই শুধু তাঁর একার নয়; এটি হাজারো শ্রমজীবী মানুষের নীরব সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

এই মানুষগুলোর গল্প খুব কমই শিরোনাম হয়। অথচ তাঁদের ঘামেই সচল থাকে গ্রামবাংলার অর্থনীতি। তাঁদের শ্রমেই টিকে থাকে কৃষি, গবাদিপশু, হাট-বাজার। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের গল্পে তাঁদের নাম না থাকলেও বাস্তব জীবনের প্রতিটি ভোরে তাঁরা উপস্থিত—নিঃশব্দে, দৃঢ়তায়।

কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এই ঠেলাগাড়িটি যেন একটি প্রতীক—জীবন যতই অস্পষ্ট হোক, থেমে থাকা যায় না। সামনে না দেখেও এগোতে হয়। কারণ পেছনে ফেরা মানেই অনাহার।

এই মানুষগুলোই আমাদের সমাজের নীরব নায়ক।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন