খেজুরের রসে ভর করে জীবিকা : কাঁধে হাঁড়ি নিয়ে গাছির নীরব সংগ্রাম

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১০:২৮ এএম

শীতের কুয়াশাভেজা ভোর। চারদিকে সবুজ মাঠের নীরবতা ভেঙে এক কৃষক ধীর পায়ে হেঁটে চলেছেন। কাঁধে বাঁশের কাঁটা, দুই পাশে ঝুলছে মাটির হাঁড়ি। হাঁড়িগুলোতে ভরা খেজুরের টাটকা রস। এই দৃশ্য গ্রামবাংলার শীতকালীন জীবনের এক চিরচেনা ছবি—যেখানে পরিশ্রম, ঐতিহ্য আর মিষ্টি স্বাদের গল্প একসঙ্গে মিশে আছে।

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে শীত এলেই খেজুরের রস সংগ্রহ শুরু হয়। ভোর হওয়ার আগেই গাছি বা কৃষকরা খেজুরগাছে ওঠেন। ধারালো দা দিয়ে গাছ কেটে বসানো হয় হাঁড়ি। সারা রাত ধরে ফোঁটা ফোঁটা করে জমে ওঠে রস। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই সেই হাঁড়ি নামিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হয় বাজারে কিংবা মহাজনের কাছে।

এই রস থেকেই তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী পাটালি ও ঝোলা গুড়। অনেক পরিবার পুরো শীতকাল এই খেজুরের রস আর গুড় বিক্রি করেই সংসার চালায়। স্থানীয় এক গাছি বলেন, “শীত আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এই কয়েক মাসের আয়েই সারা বছরের অনেক খরচ উঠে আসে।”

তবে এই কাজ সহজ নয়। গভীর রাতে গাছে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। শীতের কুয়াশা, পিচ্ছিল গাছ, বন্যপ্রাণীর ভয়—সবকিছু মোকাবিলা করেই রস সংগ্রহ করতে হয়। তারপরও শত কষ্টের মাঝেই লুকিয়ে আছে আনন্দ, কারণ এই রস মানেই বাড়তি আয় আর গ্রামবাংলার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা।

খেজুরের রস শুধু খাদ্য নয়, এটি গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। শীতের সকালে গরম ভাত, রস আর পিঠার সঙ্গে এর সম্পর্ক বহু পুরোনো। শহরের মানুষও শীত এলেই অপেক্ষায় থাকেন এই প্রাকৃতিক মিষ্টতার।

সবুজ মাঠ পেরিয়ে কাঁধের হাঁড়িতে খেজুরের রস নিয়ে হেঁটে চলা কৃষক যেন জানান দেন—আধুনিকতার ভিড়েও গ্রামবাংলা আজও বাঁচিয়ে রেখেছে তার নিজস্ব ঐতিহ্য। এই নীরব পরিশ্রম আর মিষ্টি রসের গল্পই আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন