ফরিদপুরে পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬ । ১:৪২ পিএম

“তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়—”
গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, জীবনসংগ্রাম আর চিরচেনা আবহকে যিনি সাহিত্যে অমর করে তুলেছিলেন, সেই পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে ফরিদপুরে।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল থেকে ফরিদপুর শহরতলীর কুমার নদীর তীরে অম্বিকাপুরে কবির সমাধিস্থল ঘিরে ছিল উৎসবমুখর ও শ্রদ্ধাবিহ্বল পরিবেশ। জেলা প্রশাসন, জসীমউদ্দীন ফাউন্ডেশন, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় এই কালজয়ী কবিকে।

ফুলেল শ্রদ্ধা, মিলাদ ও আলোচনা সভা:

সকাল সাড়ে ১০টায় কবির সমাধিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির সূচনা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর জসীমউদ্দীন ফাউন্ডেশন, ফরিদপুর প্রেসক্লাব, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়।

পরে কবির আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া শেষে কবির জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা।

বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি ও বক্তব্য:

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুস্মিতা সাহা, পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর এম এ সামাদ, ফরিদপুর প্রেসক্লাব সভাপতি কবিরুল ইসলাম সিদ্দীকি, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন পিয়াল, জেলা কালচারাল অফিসার সাইফুল হাসান মিলনসহ ফরিদপুরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন বাংলা সাহিত্যে গ্রামবাংলার প্রাণকে ভাষা দিয়েছেন। তাঁর কবিতা, গান ও গল্পে ফুটে উঠেছে কৃষক, জেলে, রাখাল, মাঝি ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। তিনি কেবল কবি নন, তিনি গ্রামবাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।

জেলা প্রশাসক বলেন, “জসীমউদ্দীনের সাহিত্য আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মকে তাঁর সাহিত্য পড়ার সুযোগ করে দিতে হলে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তাঁকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

পল্লী কবি জসীমউদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর শহরতলীর কৈজুরী ইউনিয়নের তাম্বুলখানা গ্রামে, নানার বাড়িতে। তাঁর পিতার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা, যিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মায়ের নাম আমিনা খাতুন, যিনি রাঙাছুট নামেও পরিচিত ছিলেন।

শৈশব থেকেই গ্রামীণ পরিবেশ, লোকসংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপন কবির মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল ও পরে ফরিদপুর জেলা স্কুলে (বর্তমানে ফরিদপুর জিলা স্কুল) পড়াশোনা করেন। ১৯২১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে ভর্তি হন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯২৯ সালে বিএ এবং ১৯৩১ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনে বাংলা লোকসাহিত্য ও পল্লীজীবন নিয়ে গবেষণার প্রবণতা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকর্মে গভীর ছাপ ফেলেছে।

দাম্পত্য জীবন ও পরিবার:

জসীমউদ্দীন ১৯৩৯ সালে মমতাজ বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে তিন পুত্র সন্তান—ড. জামাল আনোয়ার, খুরশিদ আনোয়ার ও আনোয়ার হাসু। পারিবারিক জীবনে কবি ছিলেন সাদাসিধে ও গ্রামঘেঁষা মানুষ।

সাহিত্যকর্ম ও অবদান:

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের সাহিত্যকর্ম মূলত গ্রামবাংলার মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাঁর লেখায় প্রেম, বিরহ, দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও মানবিক বোধ একাকার হয়ে গেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে—
নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, রাখালী, বালুচর, মাঠের রাখাল, জেলে নৌকা প্রভৃতি।

‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলা সাহিত্যে গ্রামবাংলার করুণ প্রেমকাহিনির অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর অনেক কবিতা ও গান পরবর্তীতে লোকসংগীতের অংশ হয়ে যায়, যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের অবসান ঘটে ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁকে ফরিদপুর শহরতলীর অম্বিকাপুরে সমাধিস্থ করা হয়।
আজও তাঁর সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। গবেষকরা মনে করেন, জসীমউদ্দীন না থাকলে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও অনুভূতির এমন নিখুঁত সাহিত্যিক দলিল হয়তো আমরা পেতাম না।

নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান:

জন্মবার্ষিকীর আলোচনায় বক্তারা নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান—জসীমউদ্দীনের সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধকে জানার ও ধারণ করার জন্য।

দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফরিদপুরে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর আবেগে স্মরণ করা হয় পল্লী কবি জসীমউদ্দীনকে—যিনি গ্রামবাংলার মানুষের হৃদয়ের কবি হয়ে আজও অমর।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন