ফরিদপুর–২ সংসদীয় আসন (সালথা ও নগরকান্দা উপজেলা) থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে নির্বাচন কমিশনে হলফনামা দাখিল করেছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর বিভাগ) শামা ওবায়েদ ইসলাম।
দাখিলকৃত হলফনামায় তার আয়–ব্যয়, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক ঋণ, মামলা সংক্রান্ত তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পারিবারিক ও ঠিকানাগত পরিচয়ের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই তথ্যগুলো ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর একজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং বর্তমানে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফরিদপুর–২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এবার তিনি নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রার্থীদের হলফনামা ঘিরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পেশা ও বার্ষিক আয়:
হলফনামায় শামা ওবায়েদ ইসলাম তার পেশা হিসেবে ব্যবসা ও চাকরি উল্লেখ করেছেন। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা তথ্যানুযায়ী, তাঁর বার্ষিক আয় ২১ লক্ষ ৮৯ হাজার ৭১ টাকা। আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বার্ষিক আয়কর দিয়েছেন ৩ লক্ষ ৫০ হাজার ৭২১ টাকা।
অন্যদিকে, হলফনামায় স্বামীর পেশা হিসেবেও দেখানো হয়েছে ব্যবসা ও চাকরি। তাঁর বার্ষিক আয় ৮৯ লক্ষ ২২ হাজার ৪’শ ১৮ টাকা উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীদের আয়ের উৎস ও পরিমাণ নির্ভুলভাবে প্রকাশ করতে হয়। সেই বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবেই এই তথ্য হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থাবর সম্পদের চিত্র:
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, শামা ওবায়েদ ইসলামের নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থাবর সম্পদের এই তথ্য তার ব্যক্তিগত সম্পদ বিবরণের অংশ। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ সব ধরনের স্থাবর সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও রয়েছে।
অস্থাবর সম্পদ ও আর্থিক সঞ্চয়:
হলফনামায় অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত তালিকাও সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে—
-নগদ অর্থ: ২ কোটি ৫২ লাখ ৫১ হাজার ৮৯৪ টাকা
-ব্যাংকে জমা: ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৯১২ টাকা
-শেয়ার ও বন্ড: ৫০ লাখ টাকা
-স্বর্ণালংকার: ৫০ ভরি
-যানবাহন: আনুমানিক ৩০ লাখ টাকা মূল্যমানের একটি জিপ গাড়ি
এই অস্থাবর সম্পদের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তাঁর আর্থিক লেনদেন ও বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদের এই স্বচ্ছ উপস্থাপন ভোটারদের আস্থার বিষয় হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ব্যাংক ঋণ ও দায়:
হলফনামায় ব্যাংক ঋণের তথ্যও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাঁর নামে ফ্ল্যাট ক্রয় বাবদ ব্যাংকে মোট ১ কোটি ৬৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৪ টাকা ঋণ রয়েছে বলে হলফনামায় জানানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, প্রার্থীদের সব ধরনের ঋণ ও দায়দেনা প্রকাশ করতে হয়, যাতে তাদের আর্থিক অবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়।
মামলা সংক্রান্ত তথ্য:
হলফনামার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি হলো মামলা সংক্রান্ত তথ্য। শামা ওবায়েদ ইসলাম তার হলফনামায় মোট ১৮টি মামলার তথ্য উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ১৭টি মামলা প্রত্যাহার, অব্যাহতি অথবা খালাসপ্রাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, বিচারাধীন মামলাটি নগরকান্দা থানা সংশ্লিষ্ট এবং মামলার নম্বর ৮(৮)২৪। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় বিষয়টি হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে ভোটাররা প্রার্থীর আইনি অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেয়ে থাকেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা:
শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে শামা ওবায়েদ ইসলাম উল্লেখ করেছেন, তিনি ব্যাচেলর অব সায়েন্স (বিএসসি) ডিগ্রিধারী। শিক্ষাগত যোগ্যতা একজন প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতার পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পারিবারিক পরিচয়:
হলফনামায় তার পারিবারিক পরিচয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
-পিতা: কে এম ওবায়দুর রহমান
-মাতা: শাহেদা ওবায়েদ
-স্বামী: শোভন ইসলাম ওরফে মুস্তাজিরুল শোভন ইসলাম
এই তথ্যগুলো নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম অনুযায়ী সংযুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা:
বর্তমান ঠিকানা হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলাম উল্লেখ করেছেন—
৩৮/বি, রোড নং-১৮, ব্লক-বি, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
এছাড়া স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে—
গ্রাম: লস্করদিয়া, উপজেলা: নগরকান্দা, জেলা: ফরিদপুর।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্থায়ী ঠিকানার সূত্র ধরে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফরিদপুর অঞ্চলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
হলফনামার গুরুত্ব ও ভোটারদের প্রত্যাশা:
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রার্থীদের হলফনামা ভোটারদের সামনে তাদের আর্থিক, সামাজিক ও আইনি অবস্থান স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়–সম্পদ ও মামলার তথ্য প্রকাশ ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
ফরিদপুর–২ আসনের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ভোটারদের কাছে শামা ওবায়েদ ইসলামের দাখিলকৃত হলফনামা তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৮:১৬ এএম