জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী ও সংগঠক সৈয়দা নীলিমা দোলা। ডানপন্থী রাজনীতির দিকে দলটির ঝুঁকে পড়া, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট এবং প্রগতিশীল রাজনীতির আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি এই পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
শনিবার (০৩ জানুয়ারি) বিকেলে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এনসিপির সকল দায়িত্ব ও পদ থেকে পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান।
পদত্যাগপত্রে সৈয়দা নীলিমা দোলা উল্লেখ করেন, এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে তাঁর প্রত্যাশা ছিল—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দলটি একটি মধ্যপন্থী ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির একাধিক সিদ্ধান্ত তাঁকে হতাশ করেছে। তাঁর ভাষায়, “এনসিপির পক্ষে এখন আর মধ্যপন্থী রাজনীতির নতুন পথ সৃষ্টি সম্ভব নয়। দলটি পুরোপুরি ডানপন্থী ঘরানায় ঢুকে পড়ছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির যে নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট, সেটি কোনো কৌশলগত জোট নয় বরং নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রতারণার ফল। মনোনয়ন দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেককে বিভ্রান্ত করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে দলের ভেতরে প্রচলিত ‘ক্ষমতা বা গুরুত্ব না পেয়ে চলে যাওয়া’র অভিযোগও নাকচ করেন সৈয়দা নীলিমা দোলা। তিনি বলেন, “আমাকে কেউ কোনো ক্ষমতা দেয়নি। বরং আমার প্রগতিশীল মানসিকতা ও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পরিচয়ই এতদিন এনসিপিকে শক্তি জুগিয়েছে।”
তিনি মনে করেন, দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের ‘বামপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি পরিকল্পিত কৌশল, যার মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কাছে দলকে সহজে বিক্রি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন—তাহলে যারা রয়ে গেলেন, তারা কি সবাই ডানপন্থী? এনসিপি কি আদৌ সেন্ট্রিস্ট দল?
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, এনসিপিতে যোগদানের আগেও এবং পরেও তিনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর মতে, বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর মতো কর্মীকে ধরে রাখার রাজনৈতিক সক্ষমতা এনসিপির আর নেই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের যে আস্থা ও বিশ্বাস এনসিপির ওপর ছিল, তা বিগত কয়েক মাসে ভেঙে পড়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আসন্ন সময়ে জনগণ এর যথাযথ জবাব দেবে।
দলটির ভেতরে থেকেই নারী, শিশু, শ্রমিক, আদিবাসী, হিজড়া, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সেন্ট্রিস্ট অবস্থান বজায় রাখতে লড়াই করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রান্তিক মানুষের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় এনসিপির মন্থর ও দায়সারা প্রতিবাদ তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।
সবশেষে সৈয়দা নীলিমা দোলা বলেন, তাঁর মতো মানুষদের এনসিপি থেকে বিদায় প্রমাণ করে—বাংলাদেশে এনসিপির বাইরেও জুলাইয়ের আরেকটি পক্ষশক্তি রয়েছে। তিনি এনসিপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি শুভকামনা জানালেও ধর্মীয় রাজনীতিকে সামনে এনে রাজনীতি করার তীব্র সমালোচনা করেন।
পোস্টে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় বিপ্লব হয়নি,” এবং শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ধর্মীয় রাজনীতির পথে হাঁটা এনসিপির জন্য বেমানান বলেও মন্তব্য করেন।
পদত্যাগপত্রের অনুলিপি তিনি এনসিপির সদস্য সচিব ও দলীয় দপ্তরে পাঠিয়েছেন বলে জানান।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৫:৪৩ পিএম