দেশের অন্যতম বৃহৎ শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী–এর উপজেলা পর্যায়ে নীরবে বাড়ছে অসন্তোষ। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, বছরের পর বছর তারা একই পদে থেকে কাজ করলেও বেতন-গ্রেড ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূর-দূরান্তে হয়রানিমূলক বদলির কারণে মনোবল ভেঙ্গে গেছে বাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠক উপজেলা প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষিকাসহ কর্মকর্তাদের, যা আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আনসার বাহিনীর অংশগ্রহণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সূত্র জানায়, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ে রাজস্বখাতভুক্ত পদ রয়েছে মাত্র তিনটি—উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশিক্ষক এবং উপজেলা প্রশিক্ষিকা। অথচ প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষিকাদের বেতন গ্রেড এখনো ১৫তম গ্রেডে রয়ে গেছে, যা ১৯৭৮ সালের পুরনো কাঠামো অনুসারে নির্ধারিত। সম্প্রতি হয়রানিমূলক বদলির প্রেক্ষিতে ফুসে উঠেছেন উপজেলা পর্যায়ে কর্মরতরা। যেকোনো মুহূর্তে বাহিনীতে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একজন উপজেলা প্রশিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কাঁধে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের সমমানের র্যাঙ্ক থাকলেও বেতনে বিশাল ফারাক। এমনকি একই বাহিনীর ব্যাটালিয়ন আনসারদের সুবেদার পদ ইতিমধ্যেই ১৩তম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে, অথচ থানা/উপজেলা প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষিকারা রয়ে গেছেন ১৫তম গ্রেডে। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। স্বল্প বেতনে এমনিতেই সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছি, তর উপর ৩০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে হয়রানিমূলক বদলির মাধ্যমে আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে ।”
বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, মাঠপর্যায়ের কর্মরতদের দাবি হলো:-
– উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদটিকে ৯ম গ্রেডে উন্নীতকরণ
– উপজেলা প্রশিক্ষক পদটিকে ১৫তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণ
– উপজেলা প্রশিক্ষক পদ থেকে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদ পূরণ
-এবং হয়রানিমূলক বদলি বন্ধকরণসহ ইতিপূর্বে যেসকল হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে, সেগুলো বাতিল করণ
তাদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে বাহিনীর শৃঙ্খলা, মনোবল ও চেইন অব কমান্ড আরও সুসংহত হবে।
অন্যদিকে, বর্তমানে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা পদে আংশিক (৫০%) পদোন্নতির সুযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, এই বৈষম্য দূর না হলে নির্বাচনের আগমুহূর্তে বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কর্মবিরতিতে যেতে পারেন যা বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকট তৈরি করতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপজেলা কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, “আমরা মাঠে কাজ করছি, ঝুঁকি নিচ্ছি, দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু পদোন্নতি ও বেতন কাঠামোতে সুবিচার পাচ্ছি না। র্যাব-এ প্রেষণে একই র্যাঙ্কে নিয়োজিত হলেও বেতন বৈষম্যের শিকার হতে হয়। অথচ একই মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন বাহিনীতে অন্য ইউনিটে কম দায়িত্বে কর্মরতরা উচ্চ গ্রেড পাচ্ছে।”
প্রসঙ্গত, উপজেলা পর্যায়ের অন্যান্য দপ্তরের প্রধানরা ৯ম গ্রেডে উন্নীত হলেও উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তারা এখনও ১০ম গ্রেডে আছেন। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, এই পদও ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা উচিত।
জানা গেছে, বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাব ইতিমধ্যে কয়েকবার সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে, তবে বাহিনীর কিছু উর্ধতন কর্মকর্তার চরম অবহেলা ও গাফিলতির কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আশাবাদী বাহিনীর বর্তমান মহাপরিচালক পরিবর্তন-সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নিয়ে এই বৈষম্যের অবসান ঘটাবেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েনের মূল দায়িত্বে থাকবেন উপজেলা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষিকারা। তাদের দাবি, এই তিনটি দাবি (বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ, শতভাগ পদোন্নতি, হয়রানিমূলক বদলি বাতিলকরণ) দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে মাঠ পর্যায়ের মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়বে, যা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৫:২২ পিএম