কম্বল বিতরণের এই যাত্রা ছিল ঘটনাবহুল ও বিপদসংকুল। ফরিদপুর থেকে সদরপুর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে পৌঁছাতে সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে অন্তত ৫৭ কিলোমিটার পথ।
দুর্গম অবস্থানের কারণে এই চরাঞ্চলের মানুষের খবর মূল ভূখণ্ডের মানুষের কাছে খুব কমই পৌঁছে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রথম আলো ট্রাস্টের শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য এই প্রত্যন্ত এলাকাকেই বেছে নেয় প্রথম আলো ফরিদপুর বন্ধুসভা।
কাকডাকা ভোরে শুরু হয় যাত্রা। দিনটি ছিল চলতি শীত মৌসুমে ফরিদপুরের সবচেয়ে শীতল দিন—তাপমাত্রা নেমে আসে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে বন্ধুসভার সদস্যরা প্রথমে ফরিদপুর শহরের কাপুড়িপট্টি এলাকা থেকে কম্বল সংগ্রহ করেন। এরপর লেগুনাযোগে সদরপুর উপজেলার শয়তানখালী ঘাটে পৌঁছে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে ট্রলারে ওঠেন।
দুই ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে তাঁরা পৌঁছান দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নন্দলালপুর খেয়াঘাটে। সেখানে আগে থেকেই স্লিপ হাতে অপেক্ষায় ছিলেন শীতার্ত দুস্থ মানুষেরা।
কম্বল হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কথা বলেন নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি গ্রামের ৮৭ বছর বয়সী রাহেলা বিবি। তিনি বলেন,“নদীভাঙনের শিকার হইছি কয়েকবার। শীত নামলে জীবন থাইমা যায়। রাইতে ঘুম অয় না। পুরান কাপড় দিয়া আর কত ঢাকমু? আজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমটা একটু আরামে হবেনে।”
শুধু রাহেলা বিবিই নন, বুধবার (০৭ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মোট ২৩৫ জন হতদরিদ্র শিশু, নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধের হাতে কম্বল তুলে দেন প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা।
কুদ্দুস মোল্লারকান্দি গ্রামের ৮৩ বছর বয়সী মুনছুরা খাতুন বলেন, “শীত আইলে হাঁটু ব্যথা করে, বুক ধইরা আসে। আগুন জ্বালাইয়াও ঠান্ডা যায় না। আজ কম্বলটা পাইয়া আল্লাহরে ডাক দিছি।”
শিকদারকান্দি গ্রামের হালিমা বেগম (৫৪) বলেন,
“এই চরে মানুষরে অনেকেই মানুষ মনে করে না। আপনারা আমাগো খোঁজ নিছেন—এইটা আমরা কোনোদিন ভুলমু না।”
দর্জিকান্দি গ্রামের ৮৯ বছর বয়সী আমেনা বিবি বলেন,
“কম্বল পাইয়া চোখে পানি আইছে। মনে হইছে আমরা এখনো একা না।”
খলিফাকান্দি গ্রামের মতলেব শেখ (৮১) বলেন,
“শীত আইলে বুড়া শরীর একদম নরম অইয়া যায়। এই কম্বলটা অনেক কাজে লাগবে।”
এছাড়াও সরকারকান্দি গ্রামের সোহেল ফরাজী (৪২) বলেন, “বাচ্চাগোর কষ্ট দেইখা বুক ফাইটে যায়। আজ কম্বল পাইয়া মনে হইতেছে এই শীতে একটু শান্তি পাইমু।”
উল্লেখ্য, নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি, কুদ্দুস মোল্লারকান্দি, শিকদারকান্দি, দর্জিকান্দি, খলিফাকান্দি, সরকারকান্দিসহ ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি, দাফাকান্দি, মাদবরকান্দি, নন্দলালপুর, আদু মোল্লারডাঙ্গীসহ মোট ১৪টি গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন,
“আমার ইউনিয়নটি ফরিদপুরের অন্যতম দুর্গম এলাকা। সরকারি কম্বলে এখানকার চাহিদা পূরণ হয় না। প্রথম আলো ট্রাস্ট এখানে এসে প্রকৃত অভাবীদের পাশে দাঁড়িয়েছে—এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।”
এই কম্বল বিতরণ কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন প্রথম আলো ফরিদপুর বন্ধুসভার সভাপতি জহির হোসেন, সহ-সভাপতি মানিক কুণ্ডু, সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল, অর্থ সম্পাদক শুভ বিশ্বাস, ক্রীড়া সম্পাদক শ্যামল মণ্ডল এবং পাঠাগার ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক প্রান্ত ঘোষ।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো ফরিদপুরের আলোকচিত্রী আলিমুজ্জামান।
সহযোগিতা করেন সদরপুরের স্বেচ্ছাসেবী মিজানুল রহমান এবং দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের দফাদার আবুল হুসাইন।
এর আগে, গত ৫ জানুয়ারি প্রথম আলো বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক সুব্রত পাল ও ক্রীড়া সম্পাদক শ্যামল মণ্ডল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দুস্থ ও শীতার্ত মানুষদের শনাক্ত করে কম্বলের স্লিপ বিতরণ করেন।

পান্না বালা, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৭:১৭ পিএম