ফরিদপুর-৪ : আলোচিত রায়হান জামিলের হাতে আছে ১০ লাখ টাকা, নেই বাড়ি-গাড়ি

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৭:০৭ এএম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুর-৪ আসন (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা) থেকে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে হলফনামা জমা দিয়েছেন মুফতি রায়হান জামিল। তরুণ এই প্রার্থী তাঁর ব্যতিক্রমী সমাজসেবা, মানবিক কার্যক্রম এবং স্বচ্ছ ব্যক্তিগত তথ্যের কারণে ইতোমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, মুফতি রায়হান জামিলের জন্ম ১৯৯৬ সালের ১০ জুন। তাঁর পিতা মৃত খবির উদ্দিন এবং মাতা নুরজাহান। বাড়ি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার মফিজউদ্দিন খালাসীর ডাঙ্গী গ্রামে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে তিনি পরিচিত একজন ধর্মভিত্তিক শিক্ষিত তরুণ হিসেবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি ‘তাকমিল’ সম্পন্ন করেছেন। পেশায় তিনি একজন বেসরকারি শিক্ষক এবং তাঁর স্ত্রী একজন গৃহিণী।

হলফনামায় উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, মুফতি রায়হান জামিলের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে তিনি এখন পর্যন্ত কোনো মামলার সঙ্গে জড়িত নন বলে হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্ন ইমেজ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিষয়টি তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আয়ের বিবরণীতে দেখা যায়, মুফতি রায়হান জামিলের বার্ষিক আয় মূলত শিক্ষকতা পেশা থেকেই আসে। তাঁর শিক্ষকতা থেকে বছরে আয় ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কৃষি জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র কিংবা ফিক্সড ডিপোজিটের মতো কোনো খাতে তাঁর আয় বা বিনিয়োগ নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর আয়ের উৎস সীমিত এবং নির্দিষ্ট।

অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাঁর কাছে বর্তমানে নগদ অর্থ রয়েছে ১০ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৭ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার ১৩৩ টাকা। তবে স্থাবর সম্পদের ঘরে তিনি কোনো কৃষি জমি, বাড়ি-গাড়ি কিংবা ভবনের মালিকানা নেই বলে হলফনামায় ঘোষণা দিয়েছেন। একজন সংসদ প্রার্থীর হলফনামায় স্থাবর সম্পদ না থাকার বিষয়টি ভোটারদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সরল জীবনযাপনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে মুফতি রায়হান জামিল মূলত আলোচনায় এসেছেন তাঁর ব্যতিক্রমী মানবিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। ফরিদপুর-৪ আসনে দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ পরিচালনা করে আসছেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাত্র ১০ টাকায় ইলিশ মাছ বিতরণের উদ্যোগ নিয়ে তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি ব্যয়বহুল খাদ্যসামগ্রী সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এনে দেওয়ার এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

এর ধারাবাহিকতায় গত ৩০ নভেম্বর ১ টাকা দরে গরুর মাংস বিতরণ করেন তিনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় এমন উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করে। এর আগে ১১ জুলাই মাত্র ২ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ করে তিনি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেন। এসব উদ্যোগ তাঁকে ‘মানবিক প্রার্থী’ হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

এছাড়াও নির্বাচনী প্রচারণার সময় গেট ও ব্যানার ভাঙচুরের প্রতিবাদে ঝাড়ু হাতে মিছিল করে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমাত্রার প্রতিবাদ জানান, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে পরিচ্ছন্ন রাজনীতি ও অহিংস প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। গভীর রাতে দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে এক বস্তা করে চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও স্থানীয়দের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।

স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশ মনে করছেন, মুফতি রায়হান জামিলের এই কর্মকাণ্ড কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ বয়স, স্বচ্ছ হলফনামা, মামলা-মোকদ্দমাহীন জীবন এবং আলোচিত মানবিক উদ্যোগ তাঁকে ফরিদপুর-৪ আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে নিয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টির এই প্রার্থীর হলফনামা ও জীবনবৃত্তান্তে অর্থবিত্তের চেয়ে সমাজসেবা ও মানবিক কার্যক্রমই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনের মাঠে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে আলোচিত উদ্যোগ ও স্বচ্ছ হলফনামার কারণে মুফতি রায়হান জামিল যে ফরিদপুর-৪ আসনের নির্বাচনী আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছেন, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন