ফরিদপুরে কুকুর–বিড়ালের কামড়ে আতঙ্ক, মিলছে না এন্টিরেবিস ভ্যাকসিন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

ফরিদপুরে দিন দিন বাড়ছে কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের ঘটনা। অথচ এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সময়েই সংকট দেখা দিয়েছে জীবনরক্ষাকারী এন্টিরেবিস ভ্যাকসিনের। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে বেসরকারি ফার্মেসি—কোথাও মিলছে না পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন। ফলে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন কামড়ে আক্রান্ত ভুক্তভোগীরা।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে শুধুমাত্র এই হাসপাতাল থেকেই ১৬ হাজার ২১৭ জনকে এন্টিরেবিস ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩৮৬ জন এবং বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আহত হয়েছেন ১১ হাজার ১৩৮ জন। চিকিৎসকদের মতে, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে ফরিদপুরে রেবিস ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে সেই ঝুঁকি মোকাবিলার প্রধান অস্ত্র এন্টিরেবিস ভ্যাকসিনই মিলছে না। গত ৩-৪ দিন ধরে জেলার বিভিন্ন ফার্মেসিতে একাধিক কোম্পানি ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সরকারি হাসপাতালেও ১৫ দিন ধরে ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কামড়ে আহত হয়ে হাসপাতালে এসে তারা ভ্যাকসিন না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। সদর উপজেলার কানাইপুর এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক আব্দুল মালেক বলেন, “রাস্তার কুকুর কামড় দেওয়ার পর ডাক্তার বললো দ্রুত ভ্যাকসিন নিতে। হাসপাতালে এসে শুনি ভ্যাকসিন নাই। বাইরে ফার্মেসি ঘুরেও পাইনি। এখন খুব ভয় লাগতেছে।”

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ভাঙ্গা উপজেলার গৃহবধূ নাসরিন আক্তার। তিনি বলেন, “আমার ছোট ছেলেকে বিড়াল কামড়েছে। রেবিস হলে তো বাঁচার সুযোগ নাই। কিন্তু কোথাও ভ্যাকসিন পাচ্ছি না। সন্তানকে নিয়ে কী করবো বুঝতে পারছি না।”

চিকিৎসকরা বলছেন, রেবিস একটি শতভাগ প্রাণঘাতী রোগ, তবে সময়মতো ভ্যাকসিন নিলে তা পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “কামড়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভ্যাকসিন না থাকলে আমরা রোগীদের কীভাবে সুরক্ষা দেব?”

এ বিষয়ে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘কে বলেন, “গত ১৫ দিন ধরে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে কোনো ভ্যাকসিন সাপ্লাই নেই। দুই-তিনদিন ধরে ফার্মেসীতেও পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে, ভ্যাকসিন সংকটের বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করেছি। যোগাযোগ রাখছি, টেন্ডারও হয়েছে। আশা করছি অতিদ্রুতই এর সমাধান হবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।” তবে কবে নাগাদ ভ্যাকসিন সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি তিনি।

সচেতন নাগরিক মহল বলছে, এটি শুধু একটি ওষুধ সংকট নয়, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’কে বলেন, “রেবিস কোনো সাধারণ রোগ নয়। একটি কামড় মানেই একটি জীবন ঝুঁকিতে। অথচ আমরা দেখছি দায়িত্বশীল মহলের গাফিলতি। আগে থেকেই যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন মজুত রাখা হতো, তাহলে আজ মানুষ এভাবে দিশেহারা হতো না।”

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত তিন বছরের জন্য একটি চাহিদা করে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা। যাতে কোনো বছরই সংকট না হয়। এছাড়া একটি ভ্যাকসিন চারজনকে দিতে হয়। যেটা নাগরিকের জন্য কিনতেও সমস্যা। তাই সরকারকেই এই ভ্যাকসিন সরবারহ করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু ভ্যাকসিন সরবরাহ নয়, একই সঙ্গে কুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নিয়মিত টিকাদান, স্ট্রিট ডগ ম্যানেজমেন্ট এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, শহর ও গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ভবঘুরে কুকুর। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অথচ পৌরসভা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেবিস প্রতিরোধে তিনটি বিষয় একসঙ্গে জরুরি—পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা, দ্রুত চিকিৎসাসেবা এবং প্রাণী নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। এই তিনটির যেকোনো একটি ব্যাহত হলে মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে।

ফরিদপুরে কুকুর–বিড়ালের কামড়ের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে অবিলম্বে ভ্যাকসিন সংকট সমাধান না হলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনই যদি স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে উদ্যোগ না নেন, তাহলে এই নীরব সংকট যে কোনো সময় প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন