মানুষ এই দুনিয়ায় নানা প্রলোভন ও আবেদনের তাড়নায় কাজ করে থাকে। কখনো অর্থের মোহ, কখনো খ্যাতি ও যশের লালসা, কখনো ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা—আবার কখনো নারীসঙ্গ বা লোকরঞ্জনের বাসনা তাকে চালিত করে। প্রভুত্বপ্রিয়তা ও মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও অনেক সময় মানুষের কর্মপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এসব জাগতিক উদ্দেশ্যকে বলা হয় ‘গায়রুল্লাহ’। আর এই ধরনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত আমলকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘রিয়া’ বলা হয়। রিয়ায় আক্রান্ত কোনো কাজ, তা যত মহৎই মনে হোক না কেন, আল্লাহ তাআলার কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য হয় না। এমন আমল কবুলিয়তের মর্যাদা লাভ করে না।
নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—কোনো মহৎ কাজে যদি বিন্দুমাত্র রিয়া বা লোক দেখানোর প্রবণতা থাকে, তবে তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় না।
(ইমাম নাসায়ি, আস-সুনান, হাদিস: ৩১৪০)
আরেক হাদিসে নবীজি (সা.) কিয়ামতের দিনের এক ভয়াবহ দৃশ্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, সেদিন আল্লাহর সামনে তিন শ্রেণির মানুষকে হাজির করা হবে—একজন খ্যাতিমান আলেম, একজন প্রসিদ্ধ দানশীল এবং একজন বিখ্যাত শহীদ। আলেমকে জিজ্ঞাসা করা হবে, সে দুনিয়ায় কী করেছে। সে বলবে, দ্বিনের ইলম অর্জন ও তার প্রচারে জীবন ব্যয় করেছে। কিন্তু আল্লাহ বলবেন, এসব কাজ সে করেছে খ্যাতির জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়। ফলে তাকে অধোমুখ করে জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হবে। একই পরিণতি হবে দানশীল ও শহীদ পরিচয়ে খ্যাত ব্যক্তিদেরও—নিয়তের বিশুদ্ধতা না থাকার কারণে।
(ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস: ১৯০৫)
অন্যদিকে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা অল্প আমলও নাজাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। নবীজি (সা.) বলেছেন,
“তোমরা দ্বিনকে খালিস ও নির্ভেজাল করো—অল্প আমলই তোমাদের জন্য যথেষ্ট হবে।”
আল্লাহ তাআলা সৎ বান্দাদের প্রশংসা করে কোরআনে বলেন,“তারা আল্লাহর জন্যই তাদের দ্বিন ও আমলকে নির্ভেজাল করে।”
(সুরা বায়্যিনাহ: ৫)
আরও স্পষ্টভাবে আল্লাহ ইরশাদ করেন,
“জেনে রেখো, খালিস ও বিশুদ্ধ দ্বিন আল্লাহরই জন্য।”
(সুরা জুমার: ৩)
নিয়তের গুরুত্ব বোঝাতে নবীজি (সা.) বলেছেন,
“সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যে যেমন নিয়ত করবে, সে তেমন প্রতিদান পাবে। যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্যই গণ্য হবে। আর যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভ বা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
(ইমাম বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস: ১)
একজন প্রকৃত মুমিন তার আমলের বিনিময়ে প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির হিসাবেও আবদ্ধ থাকে না। জান্নাত লাভ কিংবা জাহান্নাম থেকে মুক্তির চিন্তাও তার কাছে গৌণ হয়ে যায়। কারণ সে জানে—পুরস্কার হলো পুরস্কারদাতার অনুগ্রহ, লক্ষ্য নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি।
এ কারণেই মুমিনের প্রতিটি কাজ হওয়া উচিত একান্তভাবে আল্লাহর জন্য, তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। নিয়তের এই বিশুদ্ধতাকেই শরিয়তের ভাষায় বলা হয় ‘ইখলাস’। সাহাবায়ে কেরাম এই ইখলাসের সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্পর্কে কোরআনে ঘোষণা করেছেন,“আল্লাহ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট, আর তাঁরাও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট।”
(সুরা তাওবা: ১০০)
ইখলাসই আমলের প্রাণ—এ ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৬:০০ এএম