ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চালিনগর চৌরাস্তায় ছোট্ট একটি পিঠার দোকান। সকাল-সন্ধ্যা সেই দোকান ঘিরেই জীবনের কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন রেহেনা বেগম (৪১)। অসুস্থ ও কর্মক্ষমতাহীন স্বামী, তেরো বছর বয়সী একমাত্র সন্তান আর চরম দারিদ্র্যের সংসার—সব দায় যেন একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন এই নারী।
স্থানীয়দের কাছে রেহেনা বেগম একজন পরিচিত মুখ। শীত-গ্রীষ্ম, বর্ষা—বছরের প্রায় সব সময়ই পিঠা বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। সামান্য এই আয় দিয়েই কোনোমতে পরিবারের খাবার জোটে। প্রতিদিন পিঠা বিক্রি করে গড়ে দুইশ টাকার মতো লাভ হয়। এই টাকাতেই চলে চিকিৎসা, খাবার আর নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। তবে এই আয়ে স্বচ্ছলতা তো দূরের কথা, মৌলিক চাহিদাও পূরণ হয় না।
রেহেনা বেগম জানান, স্বামীর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সামান্য ভিটেটুকুই তাদের একমাত্র সম্বল। এছাড়া উপজেলার চালিনগর গ্রামে দেড় শতক জমি থাকলেও তা পানিতে ডুবে থাকে, চাষাবাদ বা বসবাসের কোনো সুযোগ নেই। নিজেদের কোনো পাকা ঘর নেই। বর্তমানে বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাহিদুল হক মন্টুর বাড়ির পাশে একটি কুঁড়েঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
শীত মৌসুমে চালিনগর গ্রামের একটি দোকানের সামনে বিকেলে বসে পিঠা বিক্রি করেন তিনি। আর বছরের অন্য সময় পার্শ্ববর্তী সাতৈর ইউনিয়নের ডোবরা গ্রামে অবস্থিত আকিজ বশির গ্রুপের জনতা জুট মিলের সামনে পিঠার চুলা জ্বালান। তবে শীত এলেই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। শীত নিবারণের মতো পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই পরিবারের কারও।
রেহেনা বেগমের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট, “পেটই ঠিকমতো চলে না, সেখানে শীত নিবারণ তো অনেক দূরের কথা। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য পাই না। কোনো ভাতা নেই। যদি কোনো ভাতা পেতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও কষ্ট কমত।”
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম রকিবুল হাসান বলেন, “এমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। রেহেনা বেগম তার জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে আমার কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে, তিনি যদি ভাতা বা অন্য কোনো সরকারি সহায়তার উপযোগী হন, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পিঠার ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে থাকা রেহেনা বেগমের জীবনসংগ্রাম যেন সমাজের অনেক অদেখা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সহানুভূতি ও সহায়তার হাত বাড়লে হয়তো তার জীবনযুদ্ধে একটু স্বস্তি ফিরতে পারে।

এন কে বি নয়ন, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৮:২৬ পিএম