‘একটি হারানো শৈশবের অপমৃত্যু ও আমি’

গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৬:৪১ পিএম

সময়টা ছিল নব্বইয়ের দশক। তখনো জীবন খুব সহজ ছিল, আর আমার কৈশর কাটছিল মধুমতি নদীর কালনা ঘাট ঘেঁষে। সে সময়ের মধুমতি ছিল আজকের মতো শান্ত নয়—ছিল একেবারে প্রমত্ত, উন্মত্ত যৌবনে ভরা নদী।

বর্ষা এলেই তার তীব্র স্রোত আর গোলার গর্জনে আশপাশের গ্রামগুলো কেঁপে উঠত। রাতের আঁধারে নদীর গর্জন শুনে ঘুম হারাম হতো অনেকের। বিশেষ করে আকুব্বার দাদা—মুকুলের মা আর পাচির মা—তাদের চোখে-মুখে ছিল সারাক্ষণ অজানা আতঙ্ক। কখন যে ভাঙন এসে ঘরবাড়ি গিলে খাবে, সেই দুশ্চিন্তা ছিল নিত্যসঙ্গী।

নদীভাঙন, স্রোত আর অনিশ্চয়তার মাঝেও মধুমতির ছিল এক অদ্ভুত মায়া, এক অনির্বচনীয় চার্ম। সেই চার্মের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল নদী পারাপারের বাহন—ভাটিয়াপাড়াগামী সেই পালতোলা টাভুরে নৌকা। আহা!

যে মানুষ জীবনে একবারও টাভুরে নৌকায় চড়েনি, সে কখনোই বুঝবে না নদীর সঙ্গে মিশে যাওয়ার আনন্দ কাকে বলে। প্রবল স্রোতের বিপরীতে পাল তুলে উজানে ছুটে চলা, নৌকার তলা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া পানির কলকল শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হতো জীবন নিজেই যেন এক ছন্দে বাঁধা।

মাঝির কণ্ঠে ভেসে আসত,
“মাঝিরে মন, মাঝিরে তোর বৈঠা নে রে…”
অথবা,
“ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে ছাড়িয়া…”

এই গানের মূর্ছনায় কখন যে ভাইটেপাড়ায় পৌঁছে যেতাম, টেরই পেতাম না। নদী, গান আর নৌকা—সব মিলিয়ে সে ছিল আমার শৈশব আর কৈশরের মুক্ত পৃথিবী।

সময় থেমে থাকেনি। শৈশব গেছে, কৈশর গেছে, যৌবনও প্রায় শেষের পথে। মধ্য বয়সে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম—মধুমতির যৌবনও ফুরিয়ে গেছে। নদী আর আগের মতো নেই, টাভুরে নৌকা নেই, শেষমেশ নৌকা নামের যানটাই বিদায় নিয়েছে। সব বদলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কালনা তথা মধুমতি সেতু—উন্নয়নের প্রতীক, অথচ আমার কাছে এক নিঃশব্দ ঘাতক।

তাই হ্যাঁ, আমি কালনা সেতুকে অভিশাপ দিই। অভিশাপ দিই সেই সময়কেও, যে আমার হারানো শৈশব আর কৈশর কেড়ে নিয়েছে। তবু গভীর রাতে চোখ বন্ধ করলে আজও দেখি—এক পালতোলা নৌকা, প্রমত্ত মধুমতি, আর আমি… আবার ভেসে বেড়াচ্ছি আমার যৌবনের নদীতে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন