ফরিদপুরে মঞ্চে তারেক জিয়ার কাছে ডাকা, ভাইরাল মুহূর্তে আলোচনায় ছাত্রদল নেত্রী সুমাইয়া

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১২:০৮ পিএম

ফরিদপুরের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি এখন সৈয়দা সুমাইয়া পারভীন। ডাকনাম মীনা। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রী নতুন করে আলোচনায় আসেন গত ৪ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির বিভাগীয় জনসভায়।

জনসভা চলাকালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মঞ্চের সামনে থাকা সারি থেকে তাকে কাছে ডেকে নেন, খোঁজখবর নেন এবং কুশল বিনিময় করেন। মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি হলে সেই ছবি দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক ছবিতেই যেন ফুটে ওঠে একজন তৃণমূল ছাত্রনেত্রীর রাজনৈতিক সংগ্রাম, স্বীকৃতি ও স্বপ্নের গল্প।

পারিবারিক রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠা:

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সৈয়দা সুমাইয়া পারভীন একমাত্র বোন। রাজনীতি তার পরিবারের জন্য নতুন কিছু নয়। তার মেঝ ভাই সৈয়দ আলওয়াল হোসেন তনু ফরিদপুর পৌরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ছিলেন। আরেক ভাই সৈয়দ আদনান হোসেন অনু বর্তমানে ফরিদপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংগঠনের গল্প শুনেই বড় হয়েছেন মীনা।

তার পিতা সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা নুরুন নাহার গৃহিণী। পরিবারিক ঠিকানা ফরিদপুর পৌরসভার বায়তুল আমান। পরিবার থেকেই তিনি শিখেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা।

শিক্ষাজীবনে কৃতিত্ব ও বহুমুখী প্রস্তুতি:

শিক্ষাজীবনেও পিছিয়ে ছিলেন না তিনি। ২০০৭ সালে ফরিদপুরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৯ সালে সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ২০০৯–২০১০ সেশনে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীলতার প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি ফ্যাশন ডিজাইনে ডিপ্লোমাও সম্পন্ন করেন। তার মতে, রাজনীতির পাশাপাশি নিজের দক্ষতা ও চিন্তাকে সমৃদ্ধ করাও জরুরি।

ছাত্ররাজনীতিতে পদচারণা:

ছাত্ররাজনীতিতে তার সক্রিয়তা শুরু হয় সাংগঠনিক দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে। ২০১৮ সালে তিনি ফরিদপুর মহানগর ছাত্রদলের ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সংগঠনের ভেতরে তার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। ২০২০ সাল থেকে তিনি ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি স্বল্প সময়ের জন্য ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

সহপাঠী ও সহকর্মীদের মতে, সংগঠনের সংকটময় মুহূর্তে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতাই তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।

হামলা, প্রতিবাদ এবং তারেক রহমানের ফোন:

২০২২ সালে দলীয় একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে ছাত্রলীগের ন্যাক্কারজনক হামলার শিকার হন সৈয়দা সুমাইয়া পারভীন। সেই ঘটনায় আহত হলেও দমে যাননি তিনি। বরং সেই সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে তাকে ফোন করে খোঁজখবর নেন। পরে আরও একবার তারেক রহমানের ফোন পেয়েছেন বলে জানান তিনি। একজন কেন্দ্রীয় নেতার এমন ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেওয়াকে তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন।

রাজেন্দ্র কলেজের জনসভা ও ভাইরাল মুহূর্ত:

গত ৪ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির বিভাগীয় জনসভা ছিল দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। সেই জনসভায় হাজারো নেতাকর্মীর ভিড়ের মধ্যেই তারেক রহমান মঞ্চের কাছে ডেকে নেন সুমাইয়াকে। ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে সেই মুহূর্ত—একজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে এক তৃণমূল ছাত্রনেত্রীর আবেগঘন সাক্ষাৎ। ছবিটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এ বিষয়ে সুমাইয়া পারভীন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমাদের সর্বোচ্চ আবেগের জায়গা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে দেখা করে সালাম দিতে পারা আমার জন্য সত্যিই আবেগের। আমার রাজনৈতিক জীবনে এটি আমার সর্বোচ্চ পাওয়া।”

রাজনীতিতে আসার দর্শন:

রাজনীতিতে আসার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলাই তার মূল লক্ষ্য। তার ভাষায়, “মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জায়গাটাই আমাকে রাজনীতিতে টেনেছে।” তিনি মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি হলো নেতৃত্ব তৈরির প্রথম ধাপ, যেখানে আদর্শ, ত্যাগ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা পাওয়া যায়।

সামাজিক দায়বদ্ধতা:

রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক কাজেও যুক্ত তিনি। ঢাকার নয়াপল্টনের একটি লায়ন্স ক্লাবের সদস্য হিসেবে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। তার মতে, রাজনীতি আর সমাজসেবা একে অপরের পরিপূরক।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন:

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সুমাইয়া পারভীন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘কে বলেন, দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন। এরপর দল যেভাবে তাকে মূল্যায়ন করবে, সেভাবেই এগিয়ে যেতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, রাজনীতি মানে শুধু পদ নয়, দায়িত্ব ও মানুষের আস্থা অর্জন।

রাজনীতির কঠিন পথচলায় আবেগ, সংগ্রাম ও স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে সৈয়দা সুমাইয়া পারভীন মীনা এখন শুধু একজন ছাত্রদল নেত্রী নন, বরং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি প্রতীক। রাজেন্দ্র কলেজের মঞ্চে তারেক জিয়ার ডাকে যে মুহূর্তের জন্ম, তা হয়তো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়েই থাকবে।

 

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন