বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতি বলতে আমরা সাধারণত বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা আর টিকিটকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কিন্তু অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করেন না, সেটি হলো পাসপোর্টের শারীরিক অবস্থা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাসপোর্টের মেয়াদ ঠিক থাকলেও সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমানবন্দরেই যাত্রা আটকে যেতে পারে, এমনকি গন্তব্য দেশে প্রবেশেও বাধা আসতে পারে।
কেন পাসপোর্টের অবস্থা এত গুরুত্বপূর্ণ
অনেক ভ্রমণকারী মনে করেন, পাসপোর্টের মেয়াদ ও ভিসা ঠিক থাকলেই ভ্রমণে কোনো সমস্যা হবে না। বাস্তবে বিমান সংস্থা ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা পাসপোর্টের সত্যতা ও অবস্থা খুব সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করেন।
পাসপোর্টের কোণা ছেঁড়া, পানির দাগ, পৃষ্ঠা ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা ডেটা চিপে আঁচড় থাকলেও তা সন্দেহের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানবন্দরগুলোতে চেক-ইনের সময়ই এমন পাসপোর্ট নিয়ে যাত্রীদের আটকে দেওয়া হতে পারে, যদি মনে হয় সীমান্ত পরীক্ষায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে এ ধরনের সমস্যা
ব্যবসা ও অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যাও বাড়ছে। অনেক যাত্রী বৈধ ভিসা থাকার পরও ক্ষতিগ্রস্ত পাসপোর্টের কারণে বিপাকে পড়ছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ পাসপোর্ট পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কঠোর। সামান্য ত্রুটির কারণেও ছুটি নষ্ট হওয়া, জরুরি সফর বাতিল হওয়া বা অতিরিক্ত খরচে নতুন টিকিট কাটার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত পাসপোর্ট কেন ঝুঁকিপূর্ণ
আধুনিক পাসপোর্টে মাইক্রোচিপ, হলোগ্রাম এবং মেশিনে পড়ার উপযোগী বিশেষ অংশ থাকে। এসবের কোনোটি নষ্ট হলে স্ক্যানারে সমস্যা হতে পারে। আবার সীমান্ত কর্মকর্তারা পাসপোর্টে কারসাজির সন্দেহও করতে পারেন, ফলে প্রবেশে বাধা আসার ঝুঁকি বাড়ে।
ভ্রমণকারীদের সাধারণ কিছু ভুল
১. পৃষ্ঠা ছেঁড়া বা হারিয়ে যাওয়া
২. পানির বা অন্য তরলের দাগ
৩. লেমিনেশন উঠে যাওয়া বা বাঁধাই ঢিলে হয়ে যাওয়া
৪. ছবির পাশে কফির দাগ বা ময়লা
৫. কখন পাসপোর্টকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ ধরা হয়
সাধারণত কর্তৃপক্ষ দুইভাবে বিষয়টি বিবেচনা করে—
১. আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত : ছবি ও তথ্য পড়া যায়, কিন্তু পৃষ্ঠা ছেঁড়া বা দাগ রয়েছে।
২. গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত: ছবি বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অস্পষ্ট, ফলে পাসপোর্ট ব্যবহার অনুপযোগী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পাসপোর্টও বাতিল হতে পারে, তাই সন্দেহ থাকলে নতুন পাসপোর্ট করা নিরাপদ।
ইউএই বিমানবন্দরগুলোতে এয়ারলাইন্সের অবস্থান
দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ থেকে পরিচালিত এয়ারলাইন্সগুলো আইনগতভাবে নিশ্চিত করতে বাধ্য যে যাত্রীরা গন্তব্য দেশের প্রবেশ শর্ত পূরণ করছেন। পাসপোর্টে পানির দাগ, ছেঁড়া পৃষ্ঠা বা চিপের সমস্যা থাকলে ভিসা বৈধ হলেও তারা বোর্ডিং বাতিল করতে পারে।
ভ্রমণের আগে কীভাবে পাসপোর্ট পরীক্ষা করবেন
ভ্রমণের আগে কয়েকটি বিষয় দেখে নেওয়া জরুরি—
১. ছবির পৃষ্ঠা অক্ষত ও স্পষ্ট আছে কি না
২. বাঁধাই শক্ত আছে কি না এবং কোনো পৃষ্ঠা ঢিলে হয়েছে কি না
৩. ই-চিপ ঠিকভাবে কাজ করছে কি না
৪. সব তথ্য পরিষ্কার ও অক্ষত আছে কি না
এসব বিষয়ে সন্দেহ থাকলে ভ্রমণের আগে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা উচিত।
পাসপোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী করবেন
ভ্রমণের আগে : নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে। অনেক দেশে ‘Lost/Damaged Passport’ ক্যাটাগরিতে পুনঃইস্যুর আবেদন করা যায়।
বিমানবন্দরে : এয়ারলাইন্সকে জানাতে হবে। বোর্ডিং বাতিল হলে সাধারণত দূতাবাস থেকে জরুরি ভ্রমণ নথি নিতে হতে পারে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজ দেশে ফেরার জন্য ব্যবহৃত হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত পাসপোর্ট নিয়ে ইউএই নাগরিকদের দেশে ফেরা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকদের জন্য ‘রিটার্ন ডকুমেন্ট’ নামে একটি অস্থায়ী ভ্রমণ নথি রয়েছে। অনুমোদনের পর প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে এটি ইস্যু করা যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ এবং ইউএই পাস ব্যবহার করে আবেদন করা যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পাসপোর্টের ক্ষেত্রে মূল কপি বা লিখিত ব্যাখ্যা, হারানো পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ রিপোর্ট, নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্মসনদ প্রয়োজন হতে পারে। এই নথি ইমেইলে পাঠানো হয় এবং কেবল ইউএই-তে ফেরার জন্যই বৈধ থাকে।
এ ছাড়া ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় নথির কপি সঙ্গে রাখা, ভিসা ও বিমা নিশ্চিত করা এবং প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ আনন্দের হলেও ছোট একটি অসাবধানতা পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারে। তাই ভিসার পাশাপাশি পাসপোর্টের শারীরিক অবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
সূত্র : গালফ নিউজ

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৫:৪৪ এএম