প্রকৃতির অনিবার্য নিয়ম মেনে শীতের জীর্ণতা ঝরিয়ে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন ঘটেছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) পহেলা ফাল্গুন—বাংলা সনের একাদশ মাসের প্রথম দিন। শীতের কুয়াশা ও নিস্তব্ধতা পেরিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে উঠেছে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণের উচ্ছ্বাস।
তবে এবারের বসন্ত কিছুটা ভিন্ন আবহে এসেছে। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজনেও। অন্যান্য বছরের মতো বড় পরিসরে উদযাপন না হলেও সীমিত পরিসরে চলছে বসন্তবরণ।
বিশেষ করে রাজধানীবাসীর জন্য এবারের বসন্তে রয়েছে বড় এক শূন্যতা। নেই চিরচেনা অমর একুশে বইমেলা, যেখানে প্রতিবছর ফাল্গুনের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে বইপ্রেমীদের পদচারণা। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর বসন্তের রঙিন আবহে মেলা প্রাঙ্গণ জমে ওঠার দৃশ্য এবার আর দেখা যাচ্ছে না। ফলে নগরজীবনে বসন্তের আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
তারপরও বসন্ত থেমে থাকে না। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছরের মতো এবারও ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করেছে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ। তবে ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের স্থান পরিবর্তন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলার পরিবর্তে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সীমিত পরিসরে সকাল সাড়ে ৭টায় বসন্তবরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। হলুদ, বাসন্তী আর লাল রঙের পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতিতে সেখানে ছিল প্রাণের স্পন্দন, যদিও তা আগের বছরের মতো বিস্তৃত ছিল না।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পহেলা ফাল্গুন শুধু ঋতুর সূচনা নয়, এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক চেতনার অংশ। ফাগুনের লাল শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া ফুল মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কথা। তাদের আত্মত্যাগের রক্তে রঞ্জিত পথ ধরেই এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তাই বসন্ত কেবল সৌন্দর্যের নয়, দ্রোহ ও আত্মত্যাগেরও প্রতীক।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর দশকে পহেলা ফাল্গুন উদযাপনের সূচনা হয়। সে সময় পাকিস্তানি শাসনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রসংগীতসহ নানা সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে এই দিনটি পালন শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্তবরণ উৎসবের আয়োজন করে, যা পরবর্তীতে জাতীয় উৎসবে রূপ নেয়।
প্রকৃতির দিক থেকেও বসন্ত এক নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে আসে। এ সময় গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়, ফুলে ফুলে ভরে ওঠে চারদিক। কোকিলের ডাক, প্রজাপতির রঙিন ডানা আর মৃদু বাতাসে ভেসে বেড়ানো ফুলের ঘ্রাণ প্রকৃতিকে করে তোলে মোহনীয়। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার রঙিন উপস্থিতি যেন প্রকৃতির নিজস্ব উৎসব।
বসন্তকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতেও রয়েছে অসংখ্য সৃষ্টি। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন—“ফুল ফুটুক আর না ফুটুক, আজ বসন্ত।” বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম গেয়েছেন বসন্তের আবেগময় গান। আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসংখ্য গানে বসন্তের রূপ ধরা দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্যে।
সব মিলিয়ে, বসন্ত আমাদের শেখায় পরিবর্তনের কথা—জীবনের প্রতিটি শুষ্কতা ও ক্লান্তির পরেই আসে নতুন প্রাণের উন্মেষ। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিংবা সামাজিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রকৃতির এই নবজাগরণ থেমে থাকে না। তাই ভিন্ন বাস্তবতায়ও বসন্ত এসেছে তার চিরচেনা রূপে—রঙে, গন্ধে আর আশার নতুন বার্তা নিয়ে। 🌸

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১২:২৮ পিএম