ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফরিদপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতা। ঘটনাটি ঘিরে জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও বিতর্ক।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-দপ্তর বিষয়ক সম্পাদক মতিউর রহমান শিপলু তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি ওসমান হাদির দাফনস্থল নিয়ে আপত্তি তুলে মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। শিপলু আলফাডাঙ্গা উপজেলার সদর ইউনিয়নের বারইপাড়া গ্রামের মৃত মুন্নু মিয়ার ছেলে।
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এর তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। অনেকেই এটিকে ‘অসংবেদনশীল’ ও ‘অশোভন’ মন্তব্য হিসেবে আখ্যা দেন। সমালোচনার মুখে পড়ে পোস্ট দেওয়ার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় সেটি মুছে ফেলেন ওই আওয়ামী লীগ নেতা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মতিউর রহমান শিপলু বলেন, “আমি ওসমান হাদিকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পরে বুঝতে পেরেছি এটি করা ঠিক হয়নি। তাই পোস্টটি ডিলিট করে দিয়েছি। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।” তার এই স্বীকারোক্তির পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা থামেনি।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক কাজী রিয়াজ বলেন, “ওসমান হাদি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শের প্রতীক। দেশের স্বার্থে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। জাতীয় কবির সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়েছে সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে। এমন একজন দেশপ্রেমিকের মরদেহ সরানোর দাবি চরম ধৃষ্টতা ও অশ্রদ্ধার পরিচয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের মন্তব্য কেবল ব্যক্তি নয়, জাতির চেতনার ওপর আঘাত হানে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।”
গত ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়। রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি তরুণদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শহিদদের অধিকার রক্ষা, গণতান্ত্রিক চেতনা জাগ্রত করা এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ওসমান হাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে তার সহকর্মীরা দাবি করেন। তার মৃত্যু এবং দাফনকে কেন্দ্র করে তখনও নানা মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য একটি মন্তব্যও দ্রুত ভাইরাল হয়ে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে মতিউর রহমান শিপলুর পোস্ট তারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলেও অনেকেই প্রকাশ্যে এমন মন্তব্যকে ‘দলীয় ভাবমূর্তির পরিপন্থী’ বলে মনে করছেন।
ঘটনাটি নতুন করে রাজনৈতিক শালীনতা, মত প্রকাশের সীমা এবং জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে মন্তব্য করার আগে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, যাতে সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন ও উত্তেজনা তৈরি না হয়।

ফরিদপুর ও আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৪:৫৬ পিএম